সৌদি বাংলাদেশ দূতাবাস সেবা, ই-পাসপোর্ট নবায়ন ও বিমান টিকিট নির্দেশিকা ২০২৬
সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের পাসপোর্ট নবায়ন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও জরুরি কনস্যুলার সেবার জন্য রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস এবং জেদ্দা কনস্যুলেট জেনারেল প্রধান কেন্দ্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। বর্তমানে সাধারণ ও জরুরি ক্যাটাগরিতে ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট রিইস্যু আবেদন সরাসরি ও অনলাইন স্লটের মাধ্যমে সম্পন্ন করা যায়। এছাড়াও বোডিং পাস, সাশ্রয়ী বিমান টিকিট এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের প্রবাসবন্ধু বীমা ও প্রবাসী কার্ড পাওয়ার সহজ নিয়মাবলি এখানে প্রামাণ্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
১. রিয়াদ দূতাবাস ও জেদ্দা কনস্যুলেট জেনারেলের আওতাধীন সেবা
চিত্র ১: রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস চত্বরে ডিজিটাল কনস্যুলার সেবা গ্রহণ করে নতুন ই-পাসপোর্ট হাতে এক আনন্দিত প্রবাসী।
সৌদি আরবে বসবাসকারী প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীর যেকোনো কূটনৈতিক, আইনি, পাসপোর্ট ও কল্যাণমূলক সুরক্ষার প্রধান ভরসাস্থল হলো বাংলাদেশ দূতাবাস, রিয়াদ (Embassy of Bangladesh in Riyadh) এবং বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল, জেদ্দা (Consulate General of Bangladesh in Jeddah)। সৌদি আরবের বিশাল ভৌগোলিক দূরত্বের কথা বিবেচনা করে দেশটির বিভিন্ন প্রদেশকে দুই প্রধান মিশনের কনস্যুলার এখতিয়ারে ভাগ করা হয়েছে।
কূটনৈতিক মিশনদ্বয়ের আঞ্চলিক প্রশাসনিক এখতিয়ার:
- রিয়াদ দূতাবাসের আওতাধীন অঞ্চলসমূহ: রিয়াদ রাজধানী অঞ্চল, আল-কাসিম (বুরাইদা, উনাইজা), পূর্বাঞ্চল (দাম্মাম, খোবার, জুবাইল, হাফার আল-বাতিন, আল-আহসা), আল-জউফ, হাইল এবং উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত প্রদেশসমূহ। পূর্বাঞ্চলের প্রবাসীদের জন্য দাম্মামে নিয়মিত বিশেষ কনস্যুলার সেবা ডেস্ক পরিচালিত হয়।
- জেদ্দা কনস্যুলেট জেনারেলের আওতাধীন অঞ্চলসমূহ: মক্কা মুকাররমা, মদিনা মুনাওয়ারা, জেদ্দা সিটি, তাইফ, ইয়ানবু, জিজান, আসির (আভা, খামিস মুশাইত), নাজরান, বাহা এবং তাবুক অঞ্চল। পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রবাসীরা সরাসরি জেদ্দা কনস্যুলেট থেকে সেবা গ্রহণ করেন।
দূতাবাস ও কনস্যুলেটের প্রধান প্রধান নাগরিক সেবাসমূহ:
- ই-পাসপোর্ট ও মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (MRP) সেবা: নতুন পাসপোর্ট প্রদান, নবায়ন (Re-issue), তথ্য সংশোধন এবং পাসপোর্ট ক্ষতিপূরণ।
- জরুরি ট্রাভেল পারমিট (আউটপাস): যাদের পাসপোর্ট হারিয়ে গেছে বা যারা অবৈধ হয়ে দেশে ফেরার জন্য প্রস্তুত, তাদের জন্য একমুখী জরুরি প্রত্যাবাসন সনদ।
- পারিবারিক ও বাণিজ্যিক সনদ সত্যায়ন (Attestation): বিয়ে সনদ, আমমোক্তারনামা (Power of Attorney), জন্ম নিবন্ধন, একাডেমিক সার্টিফিকেট, এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স এনওসি সত্যায়ন।
- শ্রমিক কল্যাণ ও আইনি সহায়তা: বকেয়া বেতন আদায়ে নিয়োগকর্তার সাথে বৈঠক, লেবার কোর্টে অনুবাদক সরবরাহ, বন্দী প্রবাসীদের আইনি সহায়তা এবং জেল পরির্দশন।
- মরদেহ দেশে পাঠানো সমন্বয়: কোনো প্রবাসী ভাই মৃত্যুবরণ করলে সৌদি পুলিশ, হাসপাতাল ও ফরেনসিক বিভাগ থেকে ক্লিয়ারেন্স গ্রহণ করে বিনা খরচে দেশে কফিন পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা।
আপনার ইকামার স্ট্যাটাস ও অন্যান্য শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে আমাদের সৌদি কিওয়া প্ল্যাটফর্ম ও শ্রম আইন নির্দেশিকা পড়ে নিন।
২. ই-পাসপোর্ট আবেদন ও বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট পদ্ধতি
সৌদি আরবে বসবাসরত প্রবাসীদের জন্য আধুনিক ও অত্যন্ত নিরাপদ ই-পাসপোর্ট (e-Passport) সেবা পুরোদমে চালু রয়েছে। ই-পাসপোর্টের ভেতরে থাকা বায়োমেট্রিক চিপে নাগরিকের ১০ আঙুলের ছাপ, চোখের আইরিশ স্ক্যান এবং ডিজিটাল স্বাক্ষর সংরক্ষিত থাকে। এর ফলে যেকোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দ্রুততম সময়ে ই-গেট (e-Gate) অতিক্রম করা সম্ভব হয়।
ই-পাসপোর্ট আবেদনের নিখুঁত অনলাইন ধাপসমূহ:
ধাপ ১: সরকারি ওয়েবসাইটে অনলাইন ফর্ম পূরণ
স্মার্টফোন বা কম্পিউটার থেকে সরকারি ওয়েবসাইট epassport.gov.bd-এ যান। "Apply Online" অপশনে ক্লিক করে দেশ হিসেবে "Saudi Arabia" এবং মিশন হিসেবে আপনার এলাকা অনুযায়ী "Riyadh, Saudi Arabia" অথবা "Jeddah, Saudi Arabia" নির্বাচন করুন।
ধাপ ২: জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন তথ্য মিলিয়ে পূরণ
আপনার অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ (১৭ সংখ্যার ইংরেজি তথ্যসহ) অথবা জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অনুযায়ী নাম, পিতা-মাতার নাম ও স্থায়ী ঠিকানা হুবহু পূরণ করুন। আপনার বর্তমান এমআরপি (MRP) পাসপোর্টের নম্বর ও ইস্যু তারিখ সঠিকভাবে উল্লেখ করুন।
ধাপ ৩: পেজ সংখ্যা ও মেয়াদের বছর নির্বাচন
আপনি কি ৪৮ পেজ নাকি ৬৪ পেজ নিতে চান এবং মেয়াদ কি ৫ বছর নাকি ১০ বছর নিতে চান তা নির্বাচন করুন। ১৮ বছরের ঊর্ধ্বের সকল সাধারণ প্রবাসী কর্মীর জন্য ১০ বছর মেয়াদী ৪৮ পেজের পাসপোর্ট গ্রহণ করা সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও বুদ্ধিমানের কাজ। ফর্ম সাবমিট করে ৩ পৃষ্ঠার আবেদনপত্র (Application Summary) প্রিন্ট করে নিন।
ধাপ ৪: দূতাবাসে উপস্থিত হয়ে বায়োমেট্রিক প্রদান
প্রিন্ট করা ফর্ম, মূল পুরোনো পাসপোর্ট, ইকামা কপি ও ব্যাংক ড্রাফটের রসিদ নিয়ে দূতাবাসে যান। সেখানে বায়োমেট্রিক কাউন্টারে আপনার ১০ আঙুলের ছাপ, মুখের হাই-রেজোলিউশন ডিজিটাল ছবি এবং আইরিশ স্ক্যান গ্রহণ করা হবে। এনরোলমেন্ট শেষে একটি Delivery Slip প্রদান করা হবে। এই স্লিপ দিয়ে অনলাইনে পাসপোর্টের অগ্রগতি ট্র্যাক করা যায়।
৩. ই-পাসপোর্ট সরকারি ফি ও সোনালী ব্যাংক ড্রাফট পেমেন্ট
সৌদি আরবে বাংলাদেশ ই-পাসপোর্টের সরকারি ফি সরাসরি দূতাবাসে নগদ অর্থে অথবা নির্ধারিত ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়। সাধারণ প্রবাসী শ্রমিকদের সুবিধার্থে সরকার ফি কাঠামোকে দুটি প্রধান ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে: সাধারণ শ্রমিক (Worker) এবং পেশাজীবী/অন্যান্য (Professional)।
| ই-পাসপোর্টের ধরন ও পেজ সংখ্যা | মেয়াদকাল | সাধারণ প্রবাসী শ্রমিক ফি (সৌদি রিয়াল) | পেশাজীবী / উচ্চপদস্থ ক্যাটাগরি ফি |
|---|---|---|---|
| ৪৮ পৃষ্ঠা (নিয়মিত ডেলিভারি) | ৫ বছর | ১৬০ সৌদি রিয়াল (SAR) | ৪১৫ সৌদি রিয়াল (SAR) |
| ৪৮ পৃষ্ঠা (নিয়মিত ডেলিভারি) | ১০ বছর | ২৩৫ সৌদি রিয়াল (SAR) | ৫৬৫ সৌদি রিয়াল (SAR) |
| ৬৪ পৃষ্ঠা (জরুরি বা ফ্রিকোয়েন্ট ট্রাভেলার) | ৫ বছর | ২৩৫ সৌদি রিয়াল (SAR) | ৬৩০ সৌদি রিয়াল (SAR) |
| ৬৪ পৃষ্ঠা (জরুরি বা ফ্রিকোয়েন্ট ট্রাভেলার) | ১০ বছর | ৩১৫ সৌদি রিয়াল (SAR) | ৮৫০ সৌদি রিয়াল (SAR) |
ফি জমা দেওয়ার পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় ব্যাংক শাখা:
রিয়াদ বাংলাদেশ দূতাবাস এবং জেদ্দা কনস্যুলেট প্রাঙ্গণে সোনালী ব্যাংক প্রতিনিধির সরাসরি বুথ রয়েছে। এছাড়া স্থানীয় ব্যাংকে সোনালী ব্যাংকের অনুকূলে ডিমান্ড ড্রাফট (Demand Draft) করে মূল রসিদ আবেদনপত্রের সাথে জমা দিতে হয়। দূতাবাস প্রাঙ্গণে এখন সরাসরি ডিজিটাল পস (POS) মেশিনের মাধ্যমে যেকোনো সৌদি এটিএম কার্ড বা মাদা (Mada) কার্ড দিয়েও ফি পরিশোধের আধুনিক সুবিধা যুক্ত হয়েছে।
৪. বিদেশে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি শিশুদের জন্মনিবন্ধন ও প্রথম ই-পাসপোর্ট করার নিয়ম
সৌদি আরবে বহু প্রবাসী পরিবার-পরিজন নিয়ে স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদে বসবাস করেন। সৌদি আরবের মাটিতে কোনো বাংলাদেশি দম্পতির সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তার জন্য বাংলাদেশি নাগরিকত্ব প্রতিষ্ঠা ও পাসপোর্ট গ্রহণ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল আইনি প্রক্রিয়া।
ধাপ ১: সৌদি হাসপাতাল ও সিভিল অ্যাফেয়ার্স থেকে জন্মসনদ সংগ্রহ
সন্তান জন্মের পর সংশ্লিষ্ট সৌদি হাসপাতাল একটি আরবি জন্মসনদ (Notification of Birth) প্রদান করে। এরপর সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিভিল অ্যাফেয়ার্স (আহওয়াল মাদানি - الأحوال المدنية) অফিস থেকে অফিশিয়াল সৌদি জন্মসনদ সংগ্রহ করতে হয় এবং তা সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MOFA) থেকে সত্যায়ন করিয়ে নিতে হয়।
ধাপ ২: দূতাবাসে বাংলাদেশের অনলাইন জন্মনিবন্ধন (BRIS) আবেদন
সরকারি bdris.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে পিতা ও মাতার অনলাইন জন্মনিবন্ধন নম্বর দিয়ে নবজাতকের জন্মনিবন্ধনের আবেদন করুন। আবেদন ফি জমা দিয়ে দূতাবাস থেকে ১৭ ডিজিটের ইংরেজি ভেরিফাইড ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করুন।
ধাপ ৩: শিশুর প্রথম ই-পাসপোর্ট বায়োমেট্রিক
ডিজিটাল জন্মসনদের ভিত্তিতে ই-পাসপোর্টের ফর্ম পূরণ করুন। অপ্রাপ্তবয়স্ক (৬ বছরের নিচে) শিশুদের ক্ষেত্রে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আইরিশ স্ক্যান লাগে না, শুধু ডিজিটাল ছবি তোলা হয়। ৬ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের জন্য ৫ বছর মেয়াদী ই-পাসপোর্ট প্রদান করা হয়।
৫. আমমোক্তারনামা (Power of Attorney) ও হলফনামা সত্যায়ন করার নিয়ম
প্রবাসে থাকা অবস্থায় দেশে জমিজমা ক্রয়-বিক্রয়, ব্যাংক একাউন্ট পরিচালনা, ওয়ারিশ সনদ উত্তোলন কিংবা আইনি মামলা মোকদ্দমা পরিচালনার জন্য রক্তের সম্পর্কের কোনো আত্মীয়কে ক্ষমতা অর্পণ করতে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আমমোক্তারনামা প্রস্তুত করতে হয়।
দূতাবাসে আমমোক্তারনামা সত্যায়নের শর্তাবলি:
- দলিল প্রস্তুতকরণ: বাংলাদেশ সরকারের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অথবা সাধারণ লিগ্যাল কাগজে নির্দিষ্ট আইনি ফরম্যাটে আমমোক্তারনামার খসড়া টাইপ করতে হবে।
- সশরীরে উপস্থিতি ও স্বাক্ষর: যিনি ক্ষমতা দিচ্ছেন (Principal বা দাতা), তাকে মূল পাসপোর্ট, ইকামা ও ২ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবিসহ সশরীরে কনস্যুলার কর্মকর্তার সামনে উপস্থিত হতে হবে। কর্মকর্তার চোখের সামনে দলিলে স্বাক্ষর ও টিপসই প্রদান করতে হবে।
- সাক্ষীদের স্বাক্ষর: দলিলে অন্তত দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি নাগরিককে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত থেকে স্বাক্ষর করতে হবে এবং তাদের পাসপোর্ট বা ইকামার ফটোকপি দিতে হবে।
- বাংলাদেশে চূড়ান্ত সত্যায়ন: দূতাবাস থেকে সত্যায়িত হওয়ার পর দলিলটি বাংলাদেশে পাঠিয়ে সেগুনবাগিচাস্থ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার উইং থেকে পুনরায় সত্যায়ন করিয়ে নিলে তা দেশের যেকোনো রেজিস্ট্রি অফিসে শতভাগ কার্যকর হবে।
৬. পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে জরুরি ট্রাভেল পারমিট (আউটপাস) সংগ্রহের নিয়ম
প্রবাস জীবনে যেকোনো কারণে মূল পাসপোর্ট হারিয়ে যেতে পারে, আগুনে পুড়ে যেতে পারে কিংবা অসাধু কফিল পাসপোর্ট আটকে রেখে কর্মীকে জিম্মি করতে পারে। এমন চরম সংকটে অথবা সাধারণ ক্ষমার আওতায় অবৈধ কর্মীদের দেশে ফেরার জন্য দূতাবাস থেকে যে একমুখী জরুরি আইনি দলিল ইস্যু করা হয় তাকে আউটপাস বা ট্রাভেল পারমিট (Emergency Travel Permit) বলা হয়।
আউটপাস বা ট্রাভেল পারমিট সংগ্রহের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া:
- স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে জিডি (মাহজার): পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে নিকটস্থ সৌদি থানা বা মাকতাবুল পুলিশে গিয়ে পাসপোর্ট হারানোর সাধারণ ডায়েরি (মাহজার - بلاغ فقدان) করুন। পুলিশ আপনাকে একটি অফিশিয়াল সিলযুক্ত স্লিপ দেবে।
- সৌদি পাসপোর্ট অফিস (জাওয়াজাত) প্রিন্ট: পুলিশ রিপোর্ট নিয়ে জাওয়াজাত (Jawazat) অফিসে গিয়ে আপনার পুরোনো পাসপোর্টের তথ্য সম্বলিত "মুয়াল্লামাত প্রিন্ট" (Information Printout) সংগ্রহ করুন।
- দূতাবাসে আবেদন দাখিল: পুলিশ রিপোর্ট, জাওয়াজাত প্রিন্ট, পুরোনো পাসপোর্টের ফটোকপি (বা জাতীয় পরিচয়পত্র) এবং ৪ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবিসহ দূতাবাসে নির্ধারিত আউটপাস ফর্মে আবেদন করুন।
- নাগরিকত্ব যাচাই ও ট্রাভেল পারমিট ইস্যু: কনস্যুলার কর্মকর্তা আপনার বাংলাদেশি নাগরিকত্ব যাচাই করে ৩ মাসের মেয়াদ বিশিষ্ট একমুখী ট্রাভেল পারমিট প্রদান করবেন। এর সরকারি ফি মাত্র ৫০ থেকে ৬০ সৌদি রিয়াল।
- জাওয়াজাত থেকে খুরুজ (Exit Visa) লাগানো: এই ট্রাভেল পারমিট নিয়ে নির্ধারিত জাওয়াজাত ডিপোর্টেশন সেন্টার (তারহিল - Tarheel) এ গিয়ে আঙুলের ছাপ দিয়ে ফাইনাল এক্সিট ভিসা লাগিয়ে একমুখী টিকিটে স্বদেশে ফিরে যেতে পারবেন।
৭. ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড মেম্বারশিপ ও প্রবাসী কল্যাণ কার্ডের সুবিধা
বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড (Wage Earners' Welfare Board - WEWB) প্রতিটি বৈধ প্রবাসীর সামাজিক ও পারিবারিক সুরক্ষায় একাধিক অভাবনীয় আর্থিক সুবিধা প্রদান করে থাকে। পূর্বে এই সুবিধা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে হাজার হাজার পরিবার প্রাপ্য কোটি কোটি টাকার সরকারি অনুদান থেকে বঞ্চিত হতো।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের শীর্ষ ১০টি জীবন রক্ষাকারী সুবিধা:
- মৃত্যুজনিত আর্থিক ক্ষতিপূরণ (৪ লাখ টাকা): সৌদি আরবে কর্মরত অবস্থায় কোনো বৈধ প্রবাসী মৃত্যুবরণ করলে তার নমিনি বা পরিবারকে এককালীন ৪,০০,০০০ (চার লাখ) টাকা আর্থিক সাহায্য প্রদান করা হয়।
- বিমানবন্দর দাফন সহায়তা (৩৫ হাজার টাকা): কোনো প্রবাসীর মরদেহ বিমানে দেশে পৌঁছানোর সাথে সাথে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে তাৎক্ষণিক দাফন ও কাফনের খরচের জন্য নগদ ৩৫,০০০ টাকা পরিবারের হাতে হস্তান্তর করা হয়।
- বিনামূল্যে মরদেহ দেশে পরিবহন: সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে লাশ পরিবহনের জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বা অন্যান্য ক্যারিয়ারের সম্পূর্ণ কার্গো খরচ সরকারি কল্যাণ তহবিল থেকে বহন করা হয়।
- পঙ্গুত্ব বা অসুস্থতা অনুদান (১ লাখ টাকা): কর্মক্ষেত্রে মারাত্মক দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি হলে বা প্যারালাইজড হয়ে দেশে ফিরলে চিকিৎসার জন্য এককালীন ১ লাখ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা অনুদান পাওয়া যায়।
- সন্তানদের বার্ষিক শিক্ষাবৃত্তি: প্রবাসীর মেধাবী ছেলে-মেয়েরা পিইসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেলে প্রতি বছর ১৫,০০০ থেকে ২৮,০০০ টাকা পর্যন্ত সরকারি শিক্ষাবৃত্তি পায়। বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিশেষ মাসিক ভাতা।
- প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ: দেশে ফিরে ব্যবসা শুরু করার জন্য জামানতবিহীন পুনর্বাসন ঋণ (সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা) প্রদান করা হয় মাত্র ৪% সরল সুদে।
সৌদি আরব থেকে কীভাবে মেম্বারশিপ বা প্রবাসী কল্যাণ কার্ড পাবেন?
আপনি যদি বিএমইটি (BMET) ইমিগ্রেশন কার্ড ছাড়া বিদেশে এসে থাকেন, তবুও হতাশ হবেন না। রিয়াদ দূতাবাস বা জেদ্দা কনস্যুলেটের কল্যাণ উইংয়ে গিয়ে মাত্র ১৫০ সৌদি রিয়াল জমা দিয়ে সরাসরি কল্যাণ বোর্ডের আজীবন সদস্যপদ বা ডিজিটাল প্রবাসী কল্যাণ কার্ড সংগ্রহ করতে পারেন। এটি আপনার অনাগত ভবিষ্যৎ ও পরিবারের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ একটি বিনিয়োগ।
৮. ঢাকা-রিয়াদ-জেদ্দা ফ্লাইট টিকিট বুকিং ও ব্যাগেজ এলাউন্স নির্দেশিকা
ছুটিতে দেশে যাওয়ার সময় বিমান টিকিট ক্রয় এবং মালামালের ওজন (Baggage Allowance) নিয়ে প্রবাসীরা প্রায়ই বিভ্রান্তিতে পড়েন। ওজন সামান্য বেশি হলেই এয়ারপোর্টের চেক-ইন কাউন্টারে প্রতি কেজির জন্য মাত্রাতিরিক্ত অতিরিক্ত ব্যাগেজ ফি (Excess Baggage Charge) দাবি করা হয়।
| এয়ারলাইন্সের নাম | ফ্লাইট রুট | মূল চেক-ইন লাগেজ এলাউন্স | হ্যান্ড লাগেজ (কেবিন) | জমজমের পানি (ফ্রি) |
|---|---|---|---|---|
| বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স | রিয়াদ/জেদ্দা/মদিনা/দাম্মাম থেকে সরাসরি ঢাকা ও চট্টগ্রাম | ২টি ব্যাগ (প্রতিটি সর্বোচ্চ ২৩ কেজি = মোট ৪৬ কেজি) | ১টি ছোট ব্যাগ (সর্বোচ্চ ৭ কেজি) | ৫ লিটার সিলপ্যাক জমজম (সম্পূর্ণ ফ্রি) |
| সৌদিয়া (Saudia Airlines) | রিয়াদ/জেদ্দা থেকে সরাসরি ঢাকা | ২টি পিস (২৩ কেজি + ২৩ কেজি = ৪৬ কেজি) | ১টি হ্যান্ডব্যাগ (৭ কেজি) | ৫ লিটার সিলপ্যাক জমজম (সম্পূর্ণ ফ্রি) |
| ফ্লাইনাস (Flynas) | রিয়াদ/জেদ্দা থেকে ঢাকা (সরাসরি ও ভায়া) | টিকেট ভেদে ২০ থেকে ৩০ কেজি (টিকিটে লেখা থাকে) | ৭ কেজি কেবিন ব্যাগ | উমরাহ ভিসায় জমজম ফ্রি (অন্যদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়) |
| উপসাগরীয় এয়ারলাইন্স (Gulf Air/Air Arabia/Flydubai) | সৌদি থেকে বাহরাইন/শারজাহ/দুবাই ট্রানজিট হয়ে ঢাকা | ৩০ কেজি বা ৪০ কেজি (টিকিটের ক্লাস অনুযায়ী) | ৭ কেজি | ট্রানজিট বিধিমোতাবেক সীমিত |
লাগেজ প্যাকিংয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি কিছু এয়ারপোর্ট নিয়ম:
- জমজমের পানির সিলপ্যাক ক্যান: কোনো অবস্থাতেই সাধারণ লাগেজের ভেতরে জমজমের বোতল ঢুকাবেন না। বিমানবন্দরে স্ক্যানারে ধরা পড়লে সম্পূর্ণ লাগেজ কেটে বোতল ফেলে দেওয়া হবে। শুধুমাত্র সৌদি সরকার অনুমোদিত ৫ লিটারের সিল মারা কার্টন আলাদাভাবে বিমানবন্দরে জমা দিতে হয়, যার জন্য কোনো অতিরিক্ত চার্জ কাটা হয় না।
- পাওয়ার ব্যাংক ও লিথিয়াম ব্যাটারি: কোনো প্রকার পাওয়ার ব্যাংক বা অতিরিক্ত ব্যাটারি মূল কার্টনে দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এগুলো বাধ্যতামূলকভাবে আপনার সাথে থাকা হাতব্যাগে (Cabin Luggage) রাখতে হবে।
- স্বর্ণালংকার বহন সংক্রান্ত বাংলাদেশ কাস্টমস ব্যাগেজ রুলস: একজন পুরুষ বা নারী যাত্রী বিদেশ থেকে দেশে ফেরার সময় সর্বোচ্চ ১০০ গ্রাম (প্রায় সাড়ে ৮ ভরি) রৌপ্য অলংকার এবং ১১৭ গ্রাম (১০ ভরি) পর্যন্ত স্বর্ণালংকার কোনো প্রকার শুল্ক বা ট্যাক্স ছাড়াই ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সাথে নিয়ে যেতে পারেন। তবে এর বাইরে কোনো সোনার বার (Gold Bar) আনলে প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রামে নির্দিষ্ট সরকারি ট্যাক্স প্রদান করতে হবে।
বাংলাদেশ কাস্টমস লাগেজ রুলস ও শুল্কমুক্ত ব্যাগেজ নিয়মাবলী:
বিমানবন্দরে কাস্টমসের ঝামেলা এড়াতে ব্যাগেজ রুলস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রত্যেক যাত্রীর জন্য বাধ্যতামূলক। একজন প্রবাসী ব্যাগেজে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য কী কী শুল্কমুক্তভাবে বহন করতে পারেন তা নিচে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হলো:
- স্বর্ণালংকার ও সোনার বার: একজন পুরুষ বা নারী যাত্রী ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ ১০০ গ্রাম পর্যন্ত খাঁটি সোনার গহনা বা অলংকার সম্পূর্ণ শুল্কমুক্তভাবে বহন করতে পারেন (তবে একই ডিজাইনের ১২টির বেশি অলংকার আনা বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে গণ্য হতে পারে)। স্বর্ণের বার বা বিস্কুটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১১৭ গ্রাম (১০ তোলা) নির্দিষ্ট সরকারি শুল্ক (প্রতি তোলা ৫,০০০ টাকা) সোনালী ব্যাংকের কাস্টমস বুথে পরিশোধ সাপেক্ষে বৈধভাবে দেশে আনা যায়।
- মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেট: একজন প্রবাসী ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ২টি ব্যবহৃত মোবাইল ফোন সম্পূর্ণ শুল্কমুক্তভাবে আনতে পারেন। এর পাশাপাশি একটি নতুন সিলপ্যাক ফোন শুল্ক পরিশোধের শর্তে বহন করা যায়। বিটিআরসির (BTRC) সার্ভারে লাগেজ রিসিট ও ইমিগ্রেশন সিল দেখিয়ে সহজে ফোন রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা সম্ভব।
- ইলেকট্রনিক্স ও গৃহস্থালি পণ্য: ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য আনা একটি ল্যাপটপ বা কম্পিউটার, একটি সাধারণ ব্লেন্ডার, আয়রন মেশিন, ও টোস্টার সম্পূর্ণ ট্যাক্স-ফ্রি। কিন্তু একাধিক একই ধরনের আইটেম আনলে কাস্টমস চেকিংয়ে অতিরিক্ত শুল্ক বা বাজেয়াপ্তের ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে।
- নিষিদ্ধ সামগ্রী তালিকা: এয়ারপোর্ট লাগেজ ব্যাগেজে তরল জ্বালানি, অতিরিক্ত দাহ্য পদার্থ, ই-সিগারেট ও ভ্যাপ কার্টিজ, ড্রোন ক্যামেরা, এবং স্যাটেলাইট ফোন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বেশি পরিমাণের গুঁড়ো দুধ, সাবান কিংবা প্রসাধনী আনলে বিমানবন্দরে জরিমানা হতে পারে।
৯. প্রবাসী মরদেহ দেশে পাঠানো ও ৩৫ হাজার টাকা সরকারি অনুদান
প্রবাসে কোনো স্বদেশী ভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক এক ট্র্যাজেডি। এমন শোকাবহ পরিস্থিতিতে মৃত ব্যক্তির মরদেহ স্বদেশের মাটিতে প্রিয়জনদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পুরো দায়িত্ব দূতাবাস, কনস্যুলেট ও বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে সমন্বয় করে থাকে।
মরদেহ দেশে পাঠানোর সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া:
- হাসপাতাল ও পুলিশ নোটিফিকেশন: প্রবাসীর মৃত্যুর পর সৌদি পুলিশ (শুর্থা) ও সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের মর্গে কেস ফাইল তৈরি হয়। অস্বাভাবিক বা কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হলে ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশন সম্পন্ন হয়।
- পরিবারের পক্ষ থেকে অনাপত্তিপত্র (NOC): মৃত ব্যক্তির নিকটাত্মীয় (পিতা, মাতা, স্ত্রী বা ভাই) স্থানীয় জেলা প্রশাসক (DC) বা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এর কার্যালয় থেকে একটি "মরদেহ দেশে ফেরত আনার সম্মতিপত্র ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নি" প্রস্তুত করে দূতাবাসে পাঠান। অথবা পরিবার যদি সৌদি আরবের মাটিতেই দাফনের ইচ্ছা পোষণ করে তবে সেই মর্মে প্রত্যয়নপত্র পাঠান।
- দূতাবাসের অনাপত্তিপত্র প্রদান: দূতাবাসের শ্রম উইং সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সিভিল সিচুয়েশন (আহওয়াল মাদানি) থেকে ডেথ সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে বিমান পরিবহন ক্লিয়ারেন্স ইস্যু করে।
- বিনামূল্যে বিমানে পরিবহন: নিয়োগকর্তা যদি আইনানুযায়ী টিকিটের খরচ না দেন, তবে বাংলাদেশ সরকারের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিল থেকে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে কফিনটি দেশে পাঠানো হয়।
- বিমানবন্দরে ৩৫,০০০ টাকা হস্তান্তর: কফিনটি ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণের সাথে সাথে উপস্থিত ওয়ারিশের হাতে তাৎক্ষণিক দাফন-কাফনের জন্য নগদ ৩৫,০০০ টাকা এবং পরবর্তীতে ৪,০০,০০০ টাকার আর্থিক সাহায্য চেক হস্তান্তর করা হয়।
সৌদি শ্রম আদালত ও শরিয়াহ আদালতের মাধ্যমে রক্তের ক্ষতিপূরণ (দিয়াত বা ব্লাড মানি) আদায়:
সড়ক দুর্ঘটনা অথবা কর্মক্ষেত্রে কোনো কোম্পানির অবহেলার কারণে যদি প্রবাসীর অকালমৃত্যু ঘটে, তবে সৌদি আইন ও ইসলামিক শরিয়াহ অনুযায়ী নিহতের পরিবার মোটা অংকের আর্থিক ক্ষতিপূরণ লাভের অধিকারী হয়। এই ক্ষতিপূরণ আদায়ের আইনি প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল:
- ট্রাফিক পুলিশ (মুরুর) তদন্ত রিপোর্ট: সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটলে ট্রাফিক পুলিশ নির্ধারণ করে দুর্ঘটনার জন্য কোন পক্ষ কত শতাংশ দায়ী ছিল। যদি বিপরীত পক্ষের চালক ৫০% বা ১০০% দোষী সাব্যস্ত হয়, তবে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ও আদালতের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ বাধ্যতামূলক হয়।
- শরিয়াহ আদালতের ব্লাড মানি (দিয়াত): সৌদি আরবে অনিচ্ছাকৃত বা অবহেলাজনিত হত্যার ক্ষেত্রে নির্ধারিত দিয়াত বা ব্লাড মানির পরিমাণ ন্যূনতম ৩,০০,০০০ (তিন লাখ) থেকে ৪,০০,০০০ (চার লাখ) সৌদি রিয়াল (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত)।
- দূতাবাসের লিগ্যাল উইংয়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রেরণ: এই বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ ও বকেয়া বেতন আদায় করার জন্য বাংলাদেশে অবস্থিত নিহতের বৈধ উত্তরাধিকারীদের (স্ত্রী, সন্তান, পিতামাতা) স্থানীয় জজ কোর্ট থেকে ওয়ারিশ সনদ (Succession Certificate) সংগ্রহ করে দূতাবাসের নামে স্পেশাল আমমোক্তারনামা দিতে হয়। এরপর দূতাবাসের আইন কর্মকর্তা সৌদি আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিয়ে পুরো টাকা আদায় করে বাংলাদেশে পরিবারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরকারি চ্যানেলে স্থানান্তর করেন।
১০. ঢাকা বিমানবন্দরে বিশেষ প্রবাসী লাউঞ্জ (Probashi Lounge) সুবিধা
রেমিট্যান্স যোদ্ধা প্রবাসী ভাই-বোনদের সম্মান ও দীর্ঘ বিমানযাত্রার ক্লান্তি দূর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (HSIA) ঢাকায় উদ্বোধন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের "প্রবাসী লাউঞ্জ" (Probashi Lounge)।
প্রবাসী লাউঞ্জে যেসব সুবিধা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া যায়:
লাউঞ্জের এক্সক্লুসিভ সেবাসমূহ:
- আরামদায়ক বিশ্রামাগার: দূরপাল্লার ফ্লাইট থেকে নেমে বা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগেভাগে বিমানবন্দরে পৌঁছানো প্রবাসীরা লাউঞ্জের বিলাসবহুল সোফায় স্বাচ্ছন্দ্যে বিশ্রাম নিতে পারেন।
- বিনামূল্যে চা, কফি ও জলখাবার: লাউঞ্জে অবস্থানকারী প্রতিটি প্রবাসীকে মানসম্মত চা, কফি, বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং হালকা স্ন্যাকস সৌজন্যমূলকভাবে পরিবেশন করা হয়।
- দ্রুতগতির ওয়াইফাই ও মোবাইল চার্জিং স্টেশন: দেশে নেমেই পরিবারকে জানানো বা ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য হাই-স্পিড ফ্রি ওয়াইফাই ও সব ধরনের মোবাইল চার্জিং ক্যাবল উপলব্ধ থাকে।
- ডেডিকেটেড ইমিগ্রেশন ও হেল্পডেস্ক: কোনো ধরনের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগান্তি ছাড়াই দ্রুত ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বিশেষায়িত ফাস্ট-ট্র্যাক বুথ ও আন্তরিক হেল্পডেস্ক অফিসারদের সার্বক্ষণিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
আপনার রেমিট্যান্সের টাকা বৈধ পথে দেশে পাঠিয়ে সরকারি ২.৫% প্রণোদনা নিশ্চিত করতে আমাদের সৌদি রিয়াল রেট ও রেমিট্যান্স নির্দেশিকা অধ্যয়ন করুন।
১১. সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি (FAQs)
না, জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলেও চলবে। তবে আপনার যদি অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ (১৭ ডিজিটের ইংরেজি ভেরিফাইড সনদ) থাকে, তবে তা দিয়েই সহজে ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারবেন। আর এনআইডি থাকলে এনআইডির কপি সংযুক্ত করাই শ্রেয়।
রিয়াদ ও জেদ্দা থেকে দূরবর্তী শহরগুলোতে বসবাসরত প্রবাসীদের সুবিধার জন্য দূতাবাস দল নিয়মিতভাবে দাম্মাম, আল-আহসা, জুবাইল, বুরাইদা, খামিস মুশাইত, জিজান, তাবুক, তাইফ ও মদিনায় সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে ভ্রাম্যমাণ কনস্যুলার সেবা প্রদান করে থাকে। মিশনের ফেসবুক পেজে এর সময়সূচি প্রকাশ করা হয়।
বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যমান পরিপত্র অনুসারে, পুরোনো পাসপোর্টের তথ্যের সাথে বর্তমান আবেদনকারীর এনআইডি বা অনলাইন জন্মনিবন্ধনের তথ্যের মিল থাকতে হবে। নাম বা বয়সের গুরুতর কোনো অমিল থাকলে প্রয়োজনীয় আদালতের হলফনামা বা শিক্ষা সনদের মাধ্যমে যথাযথ যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
হ্যাঁ, পাসপোর্ট হলো প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। আপনার ইকামার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও অথবা আপনি যদি আকামাহীন বা হুরুবপ্রাপ্তও হয়ে থাকেন, বাংলাদেশ দূতাবাস অবশ্যই আপনার ই-পাসপোর্ট নবায়ন বা নতুন পাসপোর্টের আবেদন সাদরে গ্রহণ করবে।
সৌদি আরবের সরকারি সাপ্তাহিক ছুটি হলো শুক্রবার ও শনিবার। এই দুই দিন কনস্যুলার শাখা সাধারণত বন্ধ থাকে। তবে রোববার থেকে বৃহস্পতিবার প্রতিদিন সকাল ৮:০০টা থেকে বিকাল ৪:০০টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন কনস্যুলার সেবা প্রদান করা হয়।
বাংলাদেশ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) ব্যাগেজ বিধিমালা অনুসারে, একজন যাত্রী ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ ১০০ গ্রাম (প্রায় সাড়ে ৮ ভরি) রূপার অলংকার এবং ১১৭ গ্রাম (১০ ভরি) ওজনের ব্যবহৃত স্বর্ণালংকার সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধায় সাথে আনতে পারেন।
প্রবাসীর মৃত্যুর তারিখ থেকে সর্বোচ্চ ২ বছরের মধ্যে সমস্ত প্রয়োজনীয় প্রমাণক নথি (যেমন সৌদি ডেথ সার্টিফিকেট, দূতাবাসের প্রত্যয়নপত্র ও ওয়ারিশান সনদ) সহ সংশ্লিষ্ট জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস (DEMO) বা সরাসরি বোর্ডে আবেদন দাখিল করতে হয়।
সৌদি আরব সম্পর্কিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকাসমূহ:
সৌদি ইকামা চেক ও আবশের গাইড ২০২৬
রেড-গ্রিন কোম্পানি স্ট্যাটাস, মুকিম এক্সিট রি-এন্ট্রি ভিসা এবং ডিজিটাল ইকামা কার্ড নবায়ন।
কিওয়া ও সৌদি শ্রম আইন গাইড ২০২৬
ডিজিটাল চুক্তি অনুমোদন, কফিলের অনুমতি ছাড়া কফালা পরিবর্তন ও শেষ সেবা গ্র্যাচুইটি হিসাব।
সৌদি ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ট্রাফিক গাইড
দালাল ড্রাইভিং স্কুল টেস্ট, ইশারা পরীক্ষা এবং সাহের ট্রাফিক জরিমানা ৫০% মওকুফ।
পাসপোর্টে নামের বানান বা জন্মতারিখ সংশোধনের সরকারি সার্কুলার ও ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্প
অতীতে হস্তলিখিত বা এমআরপি পাসপোর্টে ভুলের কারণে যাদের বর্তমান ই-পাসপোর্টের তথ্যের সাথে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা অনলাইন জন্মনিবন্ধনের অমিল রয়েছে, তাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার বিশেষ সুযোগ প্রদান করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এনআইডি কার্ডের তথ্যের ভিত্তিতে পাসপোর্টের নাম, পিতা-মাতার নাম কিংবা জন্মতারিখ যৌক্তিকভাবে সংশোধন করা সম্ভব।
এর জন্য আবেদনের সময় অনলাইন ভেরিফায়েড এনআইডির রঙিন কপি, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ (যদি থাকে) এবং দূতাবাসের নির্ধারিত এফিডেভিট ফর্ম সত্যায়ন করে জমা দিতে হয়। কনস্যুলার টিম সমস্ত কাগজপত্র ঢাকায় প্রধান কার্যালয়ে যাচাই পাঠিয়ে দ্রুত নতুন ই-পাসপোর্ট ইস্যুর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এছাড়া দূরবর্তী অঞ্চলের প্রবাসীদের সুবিধার জন্য রিয়াদ দূতাবাস ও জেদ্দা কনস্যুলেট কর্তৃক পরিচালিত সাপ্তাহিক মোবাইল কনস্যুলার ক্যাম্পের শিডিউল অনুসরণ করে নিজ শহরেই সব সেবা সম্পন্ন করা যায়।