সৌদি কিওয়া প্ল্যাটফর্ম, শ্রম চুক্তি চেক ও কফালা পরিবর্তন নির্দেশিকা ২০২৬
সৌদি শ্রম আইনের বৈপ্লবিক সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রচলিত কাফালা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং কিওয়া (Qiwa) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ডিজিটাল চুক্তি স্বাক্ষর প্রতিটি প্রবাসীর জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কফিল বা নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়াই নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে (যেমন- ইকামা নবায়ন না করা, বেতন ৩ মাস বকেয়া থাকা) কর্মী অন্য কোম্পানিতে ট্রান্সফার বা কাফালা হতে পারেন। কিওয়ায় চুক্তি গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান, সার্ভিস বেনিফিট বা গ্র্যাচুইটি হিসাব এবং শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তির অফিসিয়াল ধাপগুলো নিচে প্রামাণ্যভাবে তুলে ধরা হলো।
১. কিওয়া (Qiwa) প্ল্যাটফর্ম কী এবং প্রবাসীদের জন্য কেন এটি অপরিহার্য?
চিত্র ১: সৌদি আরবে ডিজিটাল কিওয়া প্ল্যাটফর্মে শ্রম চুক্তি যাচাই, কর্মসংস্থান সুরক্ষা ও প্রবাসী শ্রম অধিকারের আধুনিক দৃশ্য।
সৌদি আরবের শ্রম বাজারে ব্যাপক সংস্কার এবং ভিশন ২০৩০-এর অংশ হিসেবে চালু হয়েছে কিওয়া (Qiwa - قوى) প্ল্যাটফর্ম। দেশটির মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয় (Ministry of Human Resources and Social Development - MHRSD) কর্তৃক পরিচালিত এই ইলেকট্রনিক পোর্টালটির মূল লক্ষ্য হলো মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য দূর করা এবং প্রচলিত কফালা ব্যবস্থার কঠোরতা কমিয়ে একটি সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল শ্রম পরিবেশ নিশ্চিত করা। পূর্বে যেকোনো বাংলাদেশি কর্মীকে চাকরির সুযোগ, কফালা পরিবর্তন কিংবা ছুটি সংক্রান্ত বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে কফিল বা নিয়োগকর্তার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করতে হতো। কিওয়া প্ল্যাটফর্মের আগমনের ফলে এই নির্ভরশীলতার অবসান ঘটেছে এবং প্রতিটি প্রবাসীর অধিকার এখন আইনগতভাবে সুরক্ষিত।
কিওয়া প্ল্যাটফর্মে একজন প্রবাসীর সমস্ত কর্মসংস্থান সংক্রান্ত তথ্য ডিজিটাল নথিরূপে সংরক্ষিত থাকে। নিয়োগকর্তা যখন কোনো নতুন কর্মীকে নিয়োগ দেন বা বিদ্যমান কর্মীর সাথে চুক্তি নবায়ন করেন, তখন বাধ্যতামূলকভাবে কিওয়া প্ল্যাটফর্মে তা আপলোড করতে হয়। কর্মী তার নিজস্ব জাতীয় পরিচয়পত্র বা ইকামা নম্বর এবং নাফাত (Nafath) অ্যাপের মাধ্যমে লগইন করে চুক্তির প্রতিটি শর্তাবলি স্বচক্ষে দেখতে পান এবং তা গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার সার্বভৌম অধিকার ভোগ করেন।
কিওয়া প্ল্যাটফর্মের প্রধান সেবা এবং সুবিধাগুলো:
- ডিজিটাল কর্মসংস্থান চুক্তি (Digital Work Contract): নিয়োগকর্তার মৌখিক প্রতিশ্রুতির কোনো ভিত্তি নেই; কিওয়াতে লিখিত ও অনুমোদিত চুক্তিই সৌদি শ্রম আদালতে আইনি দলীল হিসেবে স্বীকৃত।
- কর্মসংস্থান পরিবর্তন (Employee Transfer): কফিল বা বর্তমান স্পন্সরের অনাপত্তিপত্র (NOC) ছাড়াই নির্দিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ সাপেক্ষে অন্য কোম্পানিতে স্থানান্তরের আবেদন সম্পন্ন করা।
- চাকরির পদবি ও পদমর্যাদা যাচাই: পাসপোর্টের পেশা এবং কিওয়া পোর্টালে নিবন্ধিত প্রকৃত পেশা যাচাই করে ভিসা অসঙ্গতি সংশোধন করা।
- অভিজ্ঞতা সনদ প্রদান (Experience Certificate): চাকরির মেয়াদ শেষে কোনো ঝামেলা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ।
অতএব, প্রতিটি সৌদি প্রবাসীর জন্য কিওয়া প্ল্যাটফর্মে নিজের ব্যক্তিগত একাউন্ট থাকা এবং নিয়মিতভাবে কর্মসংস্থানের স্ট্যাটাস চেক করা নাগরিক সচেতনতার অন্যতম পূর্বশর্ত। আপনি যদি আপনার ইকামার বৈধতা ও আবশের পোর্টালে তথ্যের স্থিতি জানতে চান, তবে আমাদের বিস্তারিত সৌদি ইকামা চেক ও আবশের পোর্টাল নির্দেশিকা দেখে নিতে পারেন।
২. কিওয়া একাউন্ট নিবন্ধন, লগইন এবং শ্রম চুক্তি যাচাইয়ের ধাপসমূহ
কিওয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার জন্য আপনাকে প্রথমে একটি ব্যক্তিগত একাউন্ট (Individual Account) তৈরি করতে হবে। অনেকেই মনে করেন কিওয়া শুধুমাত্র কোম্পানির জন্য, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। কোম্পানির জন্য রয়েছে বিজনেস একাউন্ট এবং প্রবাসীদের জন্য রয়েছে ইনডিভিজুয়াল বা ব্যক্তিগত পোর্টাল।
কিওয়া পোর্টালে নতুন একাউন্ট খোলার ধারাবাহিক ধাপ:
ধাপ ১: অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রবেশ ও পরিচয় নিশ্চিতকরণ
স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের ব্রাউজার থেকে সরাসরি Qiwa.sa পোর্টালে যান। ভাষা হিসেবে ইংরেজি বা আরবি নির্বাচন করুন এবং "Register" অপশনে ক্লিক করুন। এরপর আপনার ১০ সংখ্যার বৈধ ইকামা নম্বর এবং জন্মতারিখ (আরবি হিজরি বা ইংরেজি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী) প্রদান করুন।
ধাপ ২: ওটিপি (OTP) ও নাফাত ভেরিফিকেশন
আপনার আবশের পোর্টালে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে একটি চার সংখ্যার এককালীন পাসওয়ার্ড (OTP) আসবে। কোডটি সঠিকভাবে ইনপুট দিন। এরপর নাফাত (Nafath) অ্যাপের স্ক্রিনে প্রদর্শিত সংখ্যার সাথে মিলিয়ে বায়োমেট্রিক কনফার্মেশন সম্পন্ন করুন।
ধাপ ৩: পাসওয়ার্ড তৈরি ও ইমেইল সংযোগ
একটি শক্তিশালী পাসওয়ার্ড তৈরি করুন যাতে বড় হাতের অক্ষর, ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা এবং বিশেষ চিহ্ন (@, #, $) অন্তর্ভুক্ত থাকে। আপনার ব্যক্তিগত একটি সক্রিয় ইমেইল আইডি দিন এবং কনফার্মেশন লিংকে ক্লিক করে একাউন্ট নিশ্চিত করুন।
ডিজিটাল চুক্তিপত্র (Work Contract) যাচাইয়ের খুঁটিনাটি:
লগইন করার পর ড্যাশবোর্ডে প্রবেশ করলেই আপনার বর্তমান সক্রিয় চুক্তি অথবা নতুন কোম্পানির প্রেরিত চুক্তি দেখতে পাবেন। এখানে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পরখ করে দেখা জরুরি:
- মূল বেতন ও ভাতা (Basic Salary & Allowances): আপনার মূল বেতন (Basic), বাসা ভাড়া ভাতা (Housing Allowance), যাতায়াত ভাতা (Transport) এবং অন্যান্য সুবিধা সঠিকভাবে আলাদা করে উল্লেখ আছে কি না। কারণ গ্র্যাচুইটি ও ওভারটাইম হিসাবের ক্ষেত্রে মূল বেতন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- চুক্তির মেয়াদ (Contract Period): চুক্তিটি নির্দিষ্ট মেয়াদী (১ বছর বা ২ বছর) নাকি অনির্দিষ্ট মেয়াদী। অধিকাংশ প্রবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মেয়াদী চুক্তি সম্পন্ন হয়।
- প্রবেশনারি পিরিয়ড (Probationary Period): সৌদি শ্রম আইনের ৫৩ ধারা অনুযায়ী শিক্ষানবিশকাল সর্বোচ্চ ৯০ দিন হতে পারে, তবে উভয় পক্ষের লিখিত সম্মতিতে তা সর্বোচ্চ ১৮০ দিন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব। এই সময়ে যেকোনো পক্ষ নোটিশ ছাড়া চুক্তি বাতিল করতে পারে।
- বিজ্ঞপ্তির সময়সীমা (Notice Period): চুক্তি নবায়ন না করতে চাইলে কত দিন পূর্বে নোটিশ দিতে হবে (সাধারণত ৬০ থেকে ৯০ দিন)।
৩. কফিলের অনুমতি ছাড়া কফালা পরিবর্তনের আইনি নিয়ম ও শর্তাবলি
সৌদি আরবের শ্রম সংস্কার উদ্যোগের (Labor Reform Initiative - LRI) অধীনে প্রবাসী কর্মীদের জন্য সবচেয়ে যুগান্তকারী পরিবর্তন হলো কফিলের অনাপত্তি বা অনুমতি (Tanakul / Tanazul without Kafeel consent) ব্যতিরেকেই কর্মসংস্থান পরিবর্তনের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা। অতীতে কফিল রাজি না থাকলে কোম্পানি পরিবর্তন করা অসম্ভব ছিল। বর্তমানে নির্দিষ্ট কিছু আইনি ব্যত্যয় ঘটলে যেকোনো প্রবাসী কর্মী আইনসম্মতভাবে অন্য কোম্পানিতে স্থানান্তরিত হতে পারেন।
যেসব পরিস্থিতিতে কফিলের অনুমতি ছাড়াই কফালা পরিবর্তন করা যায়:
১. লিখিত ও ডিজিটাল চুক্তির অনুপস্থিতি:
সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর বা পুরোনো চুক্তি শেষ হওয়ার পর নিয়োগকর্তা যদি কিওয়া প্ল্যাটফর্মে ডিজিটাল চুক্তি আপলোড ও অনুমোদন না করান, তবে কর্মী যেকোনো সময় অন্য যেকোনো বৈধ কোম্পানিতে স্থানান্তর হতে পারবেন।
২. একটানা ৩ মাস বা তার বেশি বেতন বকেয়া থাকা:
নিয়োগকর্তা যদি কোনো কর্মীকে টানা ৩ মাস (৯০ দিন) বেতন প্রদান করতে ব্যর্থ হন, অথবা ওয়েজ প্রোটেকশন সিস্টেমে (WPS) বেতন লিপিবদ্ধ না করেন, তবে কর্মী বর্তমান কফিলের কোনো প্রকার সম্মতি ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে তানাজুলের আবেদন করতে পারেন।
৩. ইকামা বা কাজের অনুমতির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া:
ইকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে কফিল যদি তা নবায়ন না করেন, অথবা সৌদি আরবে পৌঁছানোর ৩ মাসের মধ্যে নতুন কর্মীর প্রথম ইকামা ইস্যু না করা হয়, তবে শ্রম মন্ত্রণালয়ের বিধিমোতাবেক কর্মী কফালা পরিবর্তনের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যান।
৪. কোম্পানির নীতাকাত (Nitaqat) স্ট্যাটাস রেড (Red) হওয়া:
নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান যদি সৌদি সরকারের সাউদাইজেশন নীতি লঙ্ঘন করে লাল ক্যাটাগরিতে (Red Zone) পতিত হয়, তবে সেই প্রতিষ্ঠানের যেকোনো বিদেশি কর্মী বিনা বাধায় সবুজ বা প্লাটিনাম ক্যাটাগরির কোম্পানিতে চলে যেতে পারবেন।
৫. কফিলের পক্ষ থেকে মিথ্যা হুরুব (Absconding / Huroob) দেওয়া:
যদি প্রমাণিত হয় যে কফিল আক্রোশবশত মিথ্যা হুরুব রিপোর্ট দাখিল করেছেন, এবং শ্রম আদালতে শুনানির পর তা খারিজ হয়, তবে আদালত সরাসরি কর্মীকে অন্যত্র স্থানান্তরের সুযোগ প্রদান করে।
৬. চুক্তি মেয়াদের পূর্ণ সমাপ্তি ও নোটিশ প্রদান:
আপনার নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তি সমাপ্তির নির্ধারিত সময় পূর্বে (যেমন ৬০ দিন আগে) কিওয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে চুক্তি নবায়ন না করার নোটিশ দিয়ে থাকলে চুক্তি শেষ হওয়া মাত্রই আপনি স্বাধীনভাবে নতুন কর্মসংস্থানে যোগদান করতে পারবেন।
| পরিস্থিতির বিবরণ | বর্তমান কফিলের অনুমতি প্রয়োজন? | প্রয়োজনীয় প্রমাণক নথি | স্থানান্তরের গড় সময় |
|---|---|---|---|
| চুক্তির মেয়াদ শেষ ও যথাসময়ে নোটিশ প্রদান | না (অনুমতি লাগবে না) | কিওয়া নোটিশ কনফার্মেশন | চুক্তি শেষের দিন থেকে ৭ দিন |
| টানা ৩ মাস বেতন বকেয়া থাকা | না (অনুমতি লাগবে না) | ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও WPS ডেটা | ১০ থেকে ১৪ কার্যদিবস |
| ইকামার মেয়াদ শেষ (৩০ দিনের বেশি) | না (অনুমতি লাগবে না) | আবশের / মুকিম ইকামা স্ট্যাটাস | ৩ থেকে ৫ কার্যদিবস |
| প্রতিষ্ঠান রেড ক্যাটাগরি ভুক্ত | না (অনুমতি লাগবে না) | কিওয়া কোম্পানি নীতাকাত রেকর্ড | তাৎক্ষণিক (অনলাইন প্রসেস) |
| চলতি চুক্তির মাঝপথে স্বেচ্ছায় স্থানান্তর | হ্যাঁ (কফিলের ডিজিটাল সম্মতি বাধ্যতামূলক) | পারস্পরিক সমঝোতাপত্র | কফিল অনুমোদনের সাথে সাথে |
৪. নতুন কোম্পানির অফার ও কিওয়াতে কফালা অনুমোদনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা
আপনি যখন নতুন কোনো কর্মসংস্থানে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন সম্পূর্ণ স্থানান্তর প্রক্রিয়াটি কিওয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। কোনো কাগজের ফাইলিং বা পাসপোর্ট অফিসে সশরীরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তবে এই প্রক্রিয়ায় উভয় পক্ষের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
স্থানান্তর প্রক্রিয়ার বিস্তারিত ধাপসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:
- নতুন কোম্পানির আবেদন দাখিল: আপনার নতুন নিয়োগকর্তা তাদের কিওয়া বিজনেস একাউন্ট থেকে আপনার ইকামা নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে "Employee Transfer Request" পাঠাবেন। একই সাথে তারা আপনার জন্য একটি নতুন চাকরির চুক্তি তৈরি করে আপলোড করবেন।
- কর্মীর কাছে নোটিফিকেশন প্রেরণ: নতুন কোম্পানি আবেদন করার সাথে সাথে আপনার নিবন্ধিত মোবাইলে একটি এসএমএস আসবে এবং আপনার কিওয়া ইনডিভিজুয়াল ড্যাশবোর্ডে নতুন রিকোয়েস্ট প্রদর্শিত হবে।
- শর্তাবলি পাঠ ও ডিজিটাল স্বাক্ষর: আপনি কিওয়া একাউন্টে লগইন করে নতুন প্রস্তাবিত পদ, বেতন, কর্মঘণ্টা ও সুবিধাদি ভালোভাবে পড়ে সন্তুষ্ট হলে 'Accept' অপশনে ক্লিক করবেন। এটি ডিজিটাল স্বাক্ষরের সমতুল্য।
- নোটিশ পিরিয়ডের গণনা: আপনি যদি পূর্বের চুক্তির শর্ত মেনে নোটিশ পিরিয়ডে থাকেন, তবে কিওয়া সিস্টেমে নোটিশ পিরিয়ডের দিনগুলো (সাধারণত ৩০ থেকে ৯০ দিন) গণনা শুরু হবে। নোটিশ পিরিয়ড শেষ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান কফিল আপনাকে বৈধভাবে কাজে রাখতে পারেন।
- সরকারী স্থানান্তর ফি পরিশোধ: নোটিশ পিরিয়ড সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন নিয়োগকর্তাকে সরকারি কফালা ফি (প্রথমবার ২,০০০ রিয়াল, দ্বিতীয়বার ৪,০০০ রিয়াল এবং পরবর্তী প্রতিবার ৬,০০০ রিয়াল) সাদাদ (SADAD) মাধ্যমে জমা দিতে হবে।
- ইকামা ও কফালা সম্পন্ন: ফি পরিশোধের পর মুকিম ও আবশের সিস্টেমে আপনার স্পন্সরশিপের নাম পরিবর্তন হয়ে নতুন কোম্পানির নাম যুক্ত হবে এবং নতুন ডিজিটাল ইকামা ইস্যু হবে।
৫. সৌদি শ্রম আইন: কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, বাৎসরিক ছুটি ও ওভারটাইম
সৌদি আরবের ২০০৫ সালের রাজকীয় আদেশ নং এম/৫১ এবং পরবর্তীতে সংশোধিত সৌদি শ্রম আইন (Saudi Labor Law) প্রতিটি শ্রমিকের কর্মঘণ্টা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং বিশ্রামের অধিকারকে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। দুর্ভাগ্যবশত, অনেক বাংলাদেশি প্রবাসী আইনের সুস্পষ্ট ধারা না জানার কারণে অতিরিক্ত পরিশ্রম করেও ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হন।
শ্রম আইনের মৌলিক অধিকার ও কর্মপরিবেশের নিয়মাবলি:
১. দৈনিক ও সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা (ধারা ৯৮):
সৌদি শ্রম আইন অনুযায়ী সাধারণ দিনগুলোতে দৈনিক কর্মঘণ্টা সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা। পবিত্র রমজান মাসে মুসলিম শ্রমিকদের জন্য দৈনিক কর্মঘণ্টা কমিয়ে সর্বোচ্চ ৬ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৩৬ ঘণ্টা নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক।
২. ওভারটাইম হিসাবের সরকারি নিয়ম (ধারা ১০৭):
যদি কোনো কর্মীকে দিয়ে দৈনিক ৮ ঘণ্টার অতিরিক্ত কাজ করানো হয়, তবে তা অতিরিক্ত কর্মকাল বা ওভারটাইম হিসেবে গণ্য হবে। ওভারটাইমের জন্য প্রতি ঘণ্টার পারিশ্রমিক হবে কর্মীর স্বাভাবিক প্রতি ঘণ্টার মূল বেতনের সাথে অতিরিক্ত আরও ৫০% যোগ করে, অর্থাৎ মূল বেতনের ১৫০% (১.৫ গুণ)। শুক্রবার বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কাজ করানো হলে পুরো সময়টিই ওভারটাইম হিসেবে গণ্য হবে।
৩. সাপ্তাহিক ছুটি ও বিরতি (ধারা ১০১ ও ১০৪):
প্রত্যেক কর্মী সপ্তাহে অন্তত ২৪ ঘণ্টার একটানা পূর্ণ বিশ্রাম বা সাপ্তাহিক ছুটি পাওয়ার অধিকারী। সাধারণ ক্ষেত্রে শুক্রবার হলো সাপ্তাহিক ছুটির দিন, তবে প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী পারস্পরিক চুক্তিতে অন্য যেকোনো দিন নির্ধারণ করা যেতে পারে। একটানা ৫ ঘণ্টার বেশি বিরতিহীনভাবে কাজ করানো আইনত নিষিদ্ধ; প্রতি ৫ ঘণ্টা কাজের পর অন্তত ৩০ মিনিট নামাজ ও খাবারের বিরতি দিতে হবে।
৪. বাৎসরিক সবেতন ছুটি (Annual Leave - ধারা ১০৯):
একই প্রতিষ্ঠানে একটানা এক বছর কাজ সম্পন্ন করার পর কর্মী প্রতি বছর কমপক্ষে ২১ দিনের সবেতন ছুটি পাবেন। আর যদি কর্মী একই প্রতিষ্ঠানে টানা ৫ বছর বা তার বেশি সময় কর্মরত থাকেন, তবে তার বাৎসরিক ছুটির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে হবে বাধ্যতামূলক ৩০ দিন। এই ছুটির সম্পূর্ণ বেতন অগ্রিম প্রদান করতে হবে।
৫. অন্যান্য বিশেষ ছুটিসমূহ:
- ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা: উভয় ঈদে ৪ দিন করে মোট ৮ দিনের সবেতন সরকারি ছুটি।
- জাতীয় দিবস ও প্রতিষ্ঠা দিবস: সৌদি জাতীয় দিবস (২৩ সেপ্টেম্বর) এবং সৌদি প্রতিষ্ঠা দিবস (২২ ফেব্রুয়ারি) ১ দিন করে সবেতন ছুটি।
- বিবাহজনিত ছুটি: কর্মীর নিজের বিবাহের জন্য ৫ দিনের সবেতন ছুটি।
- সন্তান জন্মদান: পুরুষ কর্মীদের জন্য সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে ৩ দিনের সবেতন পিতৃত্বকালীন ছুটি।
- শোক ছুটি: স্বামী/স্ত্রী, পিতা-মাতা বা সন্তানের মৃত্যুতে ৫ দিনের সবেতন ছুটি।
৬. বেতন সুরক্ষা ব্যবস্থা (WPS / Mudad) এবং বকেয়া বেতন আদায়ের কার্যকর কৌশল
সৌদি আরবের অন্যতম সফল অর্থনৈতিক সংস্কার হলো ওয়েজ প্রোটেকশন সিস্টেম (Wage Protection System - WPS) বা বেতন সুরক্ষা ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার প্রতিটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন প্রদানের হিসাব সেন্ট্রাল ব্যাংকের মাধ্যমে রিয়েল টাইমে মনিটর করে। কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মীদের হাতে নগদ টাকা দিয়ে বেতন পরিশোধ দেখাতে পারে না; প্রতিটি কর্মীর বৈধ ব্যাংক একাউন্ট বা ডিজিটাল ওয়ালেটে মুদাদ (Mudad) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বেতন পাঠাতে হয়।
নিয়োগকর্তা বেতন আটকে রাখলে বা বিলম্ব করলে কী করবেন?
যদি আপনার নিয়োগকর্তা মাসের নির্দিষ্ট তারিখে (সাধারণত পরবর্তী মাসের ৭ তারিখের মধ্যে) বেতন পরিশোধ না করেন, তবে নিম্নলিখিত ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণ করুন:
- ব্যাংক স্টেটমেন্ট সংরক্ষণ: আপনার সৌদি ব্যাংক একাউন্টের বিগত কয়েক মাসের ডিজিটাল স্টেটমেন্ট ডাউনলোড করে পিডিএফ আকারে সংগ্রহে রাখুন, যা প্রমাণ করবে কোনো বেতন ক্রেডিট হয়নি।
- মুদাদ (Mudad) পোর্টাল চেক: Mudad.com.sa ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনার ইকামা ও ফোন নম্বর দিয়ে আপনার বেতন স্লিপ (Pay Slip) দেখুন। সেখানে বেতন কি পেইড নাকি আনপেইড দেখাচ্ছে তা যাচাই করুন।
- মন্ত্রণালয়ের হটলাইনে রিপোর্ট (19911): সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল বহুভাষিক কাস্টমার কেয়ার নম্বর হলো 19911। এই নম্বরে কল করে বাংলায় কথা বলার জন্য অনুরোধ করা যায়। সেখানে আপনার কফিলের কমার্শিয়াল রেজিস্ট্রেশন (CR) নম্বর এবং আপনার ইকামা নম্বর দিয়ে অভিযোগ ডায়েরি করুন।
- লেবার ওয়েবসাইটে অনলাইন কমপ্লেইন: MHRSD-এর নিজস্ব মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে "Labor Dispute Settlement" সেকশনে গিয়ে বকেয়া বেতনের পরিমাণ উল্লেখ করে আনুষ্ঠানিক নোটিশ প্রেরণ করুন।
৭. শেষ সেবা গ্র্যাচুইটি বা ইকরামিয়া (End of Service Benefits - EOSB) হিসাব পদ্ধতি
সৌদি আরবে প্রবাসীদের দীর্ঘ কর্মজীবনের পর সবচেয়ে বড় আর্থিক প্রাপ্তি হলো শেষ সেবা গ্র্যাচুইটি (End of Service Benefits - EOSB), যা স্থানীয় বাংলাদেশিদের মাঝে "ইকরামিয়া" বা "সার্ভিস বেনিফিট" নামে পরিচিত। সৌদি শ্রম আইনের ৮৪ থেকে ৮৮ ধারায় এই সুবিধার বিস্তারিত হিসাব ও আইনগত অধিকার স্পষ্ট করা হয়েছে। চাকরি থেকে ইস্তফা দিলে কিংবা নিয়োগকর্তা চাকরি সমাপ্ত করলে এই অর্থ পাওয়া প্রতিটি বৈধ শ্রমিকের আইনগত অধিকার।
গ্র্যাচুইটি বা ইকরামিয়া হিসাবের মৌলিক সূত্র (ধারা ৮৪):
নিয়োগকর্তা যদি কর্মীকে চুক্তি শেষে বিদায় দেন (Termination or Non-renewal by Employer), তবে হিসাবের সাধারণ নিয়ম হলো:
- প্রথম ৫ বছরের জন্য: প্রতি বছর চাকরির জন্য কর্মীর সর্বশেষ মূল বেতনের (Basic Salary + Housing Allowance) অর্ধেক মাসের বেতন (১৫ দিনের মজুরি)।
- পরবর্তী প্রতি বছরের জন্য (৫ বছরের ঊর্ধ্বকাল): প্রতি বছর চাকরির জন্য কর্মীর সর্বশেষ মূল বেতনের এক পূর্ণ মাসের বেতন (৩০ দিনের মজুরি)।
কর্মী নিজে পদত্যাগ (Resignation) করলে গ্র্যাচুইটি প্রাপ্তির অনুপাত (ধারা ৮৫):
যদি কোনো কর্মী চুক্তি চলাকালীন বা চুক্তির মেয়াদ শেষ না করেই নিজে থেকে পদত্যাগপত্র জমা দেন, তবে চাকরির মোট কার্যকালের ওপর ভিত্তি করে গ্র্যাচুইটি নির্ধারিত হবে নিম্নরূপভাবে:
| চাকরিতে কর্মরত থাকার সময়কাল | পদত্যাগজনিত গ্র্যাচুইটি প্রাপ্তির অনুপাত | উদাহরণ (ধরি সর্বশেষ পূর্ণ বেতন ৩,০০০ রিয়াল) |
|---|---|---|
| ২ বছরের কম সময় | ০% (কোনো গ্র্যাচুইটি প্রাপ্য নয়) | ০ রিয়াল |
| ২ বছর থেকে ৫ বছরের কম সময় | মোট অর্জিত গ্র্যাচুইটির এক-তৃতীয়াংশ (১/৩ বা ৩৩.৩৩%) | ৩ বছর চাকরিতে মোট অর্জিত ৪,৫০০ রিয়ালের ১/৩ = ১,৫০০ রিয়াল |
| ৫ বছর থেকে ১০ বছরের কম সময় | মোট অর্জিত গ্র্যাচুইটির দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩ বা ৬৬.৬৬%) | ৭ বছর চাকরিতে মোট প্রাপ্ত অর্থের ৬৬.৬৬% |
| ১০ বছর বা তার বেশি সময় | পূর্ণ ১০০% গ্র্যাচুইটি প্রাপ্য হবেন | কোনো কর্তন ছাড়াই সম্পূর্ণ অর্থ পাবেন |
একটি বাস্তবসম্মত হিসাবের সহজ উদাহরণ:
ধরা যাক, একজন বাংলাদেশি টেকনিশিয়ান রিয়াদের একটি কোম্পানিতে একটানা ৭ বছর বিশ্বস্ততার সাথে কাজ করেছেন। তার সর্বশেষ মূল বেতন ও বাসা ভাতা মিলিয়ে মোট বেতন ছিল ৪,০০০ সৌদি রিয়াল। কোম্পানি তাকে চুক্তি শেষে ফাইনাল এক্সিট দিচ্ছে। তাহলে তিনি কত টাকা ইকরামিয়া পাবেন?
- প্রথম ৫ বছরের জন্য: (৫ বছর × ২,০০০ রিয়াল) = ১০,০০০ রিয়াল
- পরবর্তী ২ বছরের জন্য: (২ বছর × ৪,০০০ রিয়াল) = ৮,০০০ রিয়াল
- সর্বমোট প্রাপ্তব্য গ্র্যাচুইটি: (১০,০০০ + ৮,০০০) = ১৮,০০০ সৌদি রিয়াল!
৮. পাসপোর্ট আটকে রাখার নিষেধাজ্ঞা ও লেবার কোর্টে (নাজিজ পোর্টাল) মোকদ্দমার নিয়ম
সৌদি আরবের শ্রম আইন এবং মানবাধিকার কমিশনের সবচেয়ে কড়া নির্দেশনা হলো—কোনো নিয়োগকর্তা বা কোম্পানি কোনো কর্মীর পাসপোর্ট নিজের জিম্মায় বা আটকে রাখতে পারবে না। পাসপোর্ট হলো কর্মীর একান্ত ব্যক্তিগত আন্তর্জাতিক পরিচয়পত্র এবং এটি সম্পূর্ণভাবে কর্মীর নিজ দায়িত্বে থাকবে।
পাসপোর্ট আটকে রাখার শাস্তি:
সৌদি রাজকীয় ডিক্রি অনুসারে, কোনো কফিল বা মালিক যদি কর্মীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে পাসপোর্ট নিজের কাছে রেখে দেন, তবে সেই মালিকের বিরুদ্ধে সরাসরি শ্রম আদালতে অভিযোগ করা যায়। দোষ প্রমাণিত হলে নিয়োগকর্তাকে কর্মী প্রতি ২০,০০০ সৌদি রিয়াল পর্যন্ত সরকারি জরিমানা করা হতে পারে এবং সেই প্রতিষ্ঠানের ওয়ার্ক পারমিট সেবা স্থগিত করা হয়। কর্মীর ভিসা সংক্রান্ত বা আকামা নবায়নের সাময়িক প্রয়োজন ব্যতীত পাসপোর্ট সবসময় কর্মীর পকেটে বা আলমারিতে রাখার অধিকার রয়েছে।
সৌদি শ্রম আদালতে (Labor Court) অভিযোগ ও মামলা করার ডিজিটাল ধাপ:
যদি কফিলের সাথে কোনো বিরোধ দেখা দেয় (যেমন বেতন না দেওয়া, অবৈধ ফাইনাল এক্সিট চাপিয়ে দেওয়া, পাসপোর্ট না দেওয়া কিংবা গ্র্যাচুইটি দিতে অস্বীকার করা), তবে সশরীরে কোর্টে না গিয়েও ঘরে বসে অনলাইনে মামলা দায়ের করা যায়:
ধাপ ১: আমভি (Amvi / Wedya) পোর্টালে বন্ধুত্বপূর্ণ নিষ্পত্তির আবেদন
সৌদি আরবে সরাসরি আদালতে যাওয়ার পূর্বে মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সৌহার্দ্যপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি (Amicable Settlement) প্ল্যাটফর্মে আবেদন করতে হয়। আবেদন গ্রহণের পর মন্ত্রণালয় থেকে উভয় পক্ষকে (কর্মী ও মালিক) অনলাইনে ভার্চুয়াল মিটিংয়ে হাজির হওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট তারিখ দেওয়া হয়। এই নিষ্পত্তির সর্বোচ্চ সময়সীমা হলো ২১ কার্যদিবস।
ধাপ ২: সমঝোতা না হলে লেবার কোর্টে রেফারেল
২১ দিনের মধ্যে যদি মালিক বৈঠকে না আসেন কিংবা উভয় পক্ষের মধ্যে কোনো সম্মানজনক আর্থিক সমাধান না হয়, তবে মধ্যস্থতাকারী কর্মকর্তা একটি "রেফারেল রিপোর্ট" তৈরি করেন এবং মামলাটি সরাসরি বিচার মন্ত্রণালয়ের নাজিজ (Najiz.sa) লেবার কোর্টে পাঠিয়ে দেন।
ধাপ ৩: ভার্চুয়াল কোর্ট হেয়ারিং ও রায় কার্যকর
নাজিজ পোর্টালে মামলার নম্বর বরাদ্দ হওয়ার পর সৌদি বিচারক উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন। কর্মীর সুবিধার্থে আদালত বিনামূল্যে দোভাষী (Translator) সরবরাহ করে থাকে। বিচারক রায় দিলে সেই রায় সৌদি এনফোর্সমেন্ট কোর্ট (تنفيذ - তানফিজ) দ্বারা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করা হয়। মালিক টাকা না দিলে তার ব্যাংক একাউন্ট ও সরকারি সমস্ত কার্যক্রম আদালত সরাসরি ফ্রিজ করে দেয়।
৯. সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি (FAQs)
নতুন কোনো নিয়োগকর্তা আপনাকে চুক্তির প্রস্তাব পাঠালে কিওয়া পোর্টালে তা গ্রহণ (Accept) বা প্রত্যাখ্যান (Reject) করার জন্য সাধারণত সর্বোচ্চ ১০ দিন সময় পাওয়া যায়। এই সময়ের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত না নিলে আবেদনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিস্টেম থেকে মুছে যাবে।
সাধারণত নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তিতে নোটিশের সময়সীমা উল্লেখ থাকে (অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৬০ দিন)। যদি চুক্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ না থাকে, তবে সৌদি শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তির ক্ষেত্রে অন্তত ৩০ দিন এবং অনির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তির ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬০ দিন পূর্বে নোটিশ প্রদান করতে হয়।
হ্যাঁ, অবশ্যই। ইকামার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর যদি ৩০ দিন অতিক্রান্ত হয় এবং কফিল তা নবায়ন না করে, তবে আপনি বর্তমান কফিলের কোনো প্রকার সম্মতি বা সাইন ছাড়াই কিওয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যেকোনো নতুন বৈধ প্রতিষ্ঠানে কফালা স্থানান্তর সম্পন্ন করতে পারবেন।
পাসপোর্ট আটকানো সৌদি আইনে সরাসরি দণ্ডনীয় অপরাধ। আপনি তাৎক্ষণিকভাবে শ্রম মন্ত্রণালয়ের হটলাইন 19911-এ অভিযোগ দায়ের করতে পারেন অথবা পুলিশ স্টেশনে সাধারণ ডায়েরি (মাহজার) করে শ্রম অফিসে অভিযোগ দাখিল করতে পারেন। শ্রম অফিস কফিলকে তলব করে পাসপোর্ট হস্তান্তরে বাধ্য করবে এবং মালিকের বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপ করবে।
না, গৃহকর্মী (যেমন আমেল মঞ্জিল, সাইক খাস ইত্যাদি) গৃহস্থালি শ্রমিকের (Domestic Workers) ক্যাটাগরিতে পড়ে, যা কিওয়া নয় বরং ‘মুসানেদ’ (Musaned) প্ল্যাটফর্ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কিওয়া মূলত সকল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক কর্মীদের জন্য প্রযোজ্য।
সৌদি শ্রম আইন অনুযায়ী গ্র্যাচুইটি হিসাব করা হয় কর্মীর সর্বশেষ গৃহীত প্রকৃত মজুরির ওপর, যার মধ্যে মূল বেতন (Basic) এবং নিয়মিত অপরিহার্য ভাতা হিসেবে প্রাপ্ত বাসা ভাড়া ভাতা (Housing Allowance) অন্তর্ভুক্ত থাকে। তবে অনিয়মিত বোনাস বা পরিবর্তনশীল কমিশন এতে অন্তর্ভুক্ত হয় না।
না, কোনো কর্মী যদি শ্রম মন্ত্রণালয়ে বা নাজিজ লেবার কোর্টে বিচারাধীন কোনো মামলায় অংশ নেন, তবে সেই সময়কালে মালিকের বিরুদ্ধে সিস্টেম প্রটেকশন কার্যকর থাকে। এই সময়ে কফিল কোনোভাবেই বৈধ কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা হুরুব বা জোরপূর্বক ফাইনাল এক্সিট কার্যকর করতে পারে না।
সৌদি আরব সম্পর্কিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকাসমূহ:
সৌদি ইকামা চেক ও আবশের গাইড ২০২৬
রেড-গ্রিন কোম্পানি স্ট্যাটাস, মুকিম এক্সিট রি-এন্ট্রি ভিসা এবং ডিজিটাল ইকামা কার্ড রিনিউয়াল সহায়িকা।
সৌদি রিয়াল রেট ও রেমিট্যান্স নির্দেশিকা
উরিপে, এসটিসি পে এবং বিকাশ-রকেটে ২.৫% সরকারি প্রণোদনাসহ তাৎক্ষণিক টাকা পাঠানোর নিয়ম।
সৌদি আরব প্রবাসী পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার
সৌদি আরবের জীবনযাত্রা, কাজের পরিবেশ, আইন-কানুন ও প্রয়োজনীয় সকল সহায়িকার প্রধান হাব।
ক্বিওয়া অনলাইন আরবি কন্ট্রাক্ট ডাউনলোডের সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলী ও আইনি ব্যাকআপ
সৌদি আরবে আপনার কর্মজীবনের আইনি নিরাপত্তার জন্য ডিজিটাল ক্বিওয়া কন্ট্রাক্টের একটি পিডিএফ কপি আপনার স্মার্টফোনে সেভ রাখা অত্যন্ত জরুরি। ক্বিওয়া একাউন্টে লগইন করার পর 'Services' থেকে 'Contract Authentication' অপশনে ক্লিক করুন। সেখানে আপনার সক্রিয় চুক্তির পাশে 'Download Contract' বাটন পাবেন।
এই ডিজিটাল চুক্তিটিতে সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল কিউআর কোড থাকে, যা যেকোনো আদালত, ব্যাংক লোন অনুমোদন বা পাসপোর্ট অধিদপ্তরে আইনি বৈধ দলিল হিসেবে সরাসরি গ্রহণযোগ্য হয়। কোনো কফিল বা মালিক যদি আপনাকে চুক্তিবহির্ভূত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বাধ্য করতে চায় কিংবা নির্ধারিত তারিখের ভেতর চুক্তিভিত্তিক ওভারটাইম প্রদান না করে, তবে এই চুক্তির শর্ত দেখিয়ে সরাসরি শ্রম পরিদর্শকের নিকট আইনি নোটিশ প্রদান করা সম্ভব। প্রবাসে নিজের অধিকার রক্ষায় এই পেপারটি ডাউনলোড করে সুরক্ষিত রাখা প্রতিটি শ্রমিকের আত্মরক্ষামূলক মৌলিক অধিকার।