আজকের রেট (১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) 🇸🇦 সৌদি রিয়াল: ৩২.১০ ৳
আজকের রেট (১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) 🇦🇪 আমিরাত দিরহাম: ৩২.৮৫ ৳
আজকের রেট (১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) 🇲🇾 মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত: ২৭.৪৫ ৳
আজকের রেট (১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) 🇰🇼 কুয়েতি দিনার: ৩৯২.৫০ ৳
আজকের রেট (১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) 🇶🇦 কাতারি রিয়াল: ৩৩.১৫ ৳
🇧🇩 সোনার দাম (২২ ক্যারেট): ১,৩৮,০০০ ৳/ভরি (উৎস: বাজুস · আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬)
বোনাস রেমিট্যান্সে সরকারি প্রণোদনা: +২.৫% ক্যাশ বোনাস
আজকের রেট (১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) 🇸🇦 সৌদি রিয়াল: ৩২.১০ ৳
আজকের রেট (১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) 🇦🇪 আমিরাত দিরহাম: ৩২.৮৫ ৳
আজকের রেট (১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) 🇲🇾 মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত: ২৭.৪৫ ৳
আজকের রেট (১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) 🇰🇼 কুয়েতি দিনার: ৩৯২.৫০ ৳
🇧🇩 প্রবাসী কল্যাণ ও আর্থিক সুবিধা সর্বশেষ আপডেট: অক্টোবর ২০২৬ বিশেষায়িত গাইড (প্রবাসী ব্যাংকিং)

প্রবাসী একাউন্ট খোলার নিয়ম: NRB অ্যাকাউন্ট, সোনালী ও ব্র্যাক ব্যাংকের তুলনা

প্রবাসী একাউন্ট খোলার নিয়ম NRB অ্যাকাউন্ট সোনালী ও ব্র্যাক ব্যাংকের তুলনা
চিত্র ১: বিদেশে বসেই মোবাইল ই-কেওয়াইসি (e-KYC) প্রযুক্তির মাধ্যমে সোনালী, ইসলামী, ব্র্যাক ও সিটি ব্যাংকে প্রবাসী এনআরবি একাউন্ট খোলার সম্পূর্ণ গাইড ২০২৬
📌 সারসংক্ষেপ ও মূল দিকনির্দেশনা (Executive Summary)

প্রবাস জীবনে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করার পরও অনেক রেমিট্যান্স যোদ্ধা দেশে ফিরে দেখেন তাঁদের নামে এক টাকাও সঞ্চয় নেই। কারণ দেশে নিজের নামে কোনো ব্যাংক হিসাব না থাকায় তাঁরা পুরো উপার্জনই অন্য কারও একাউন্টে বা পিন ক্যাশে পাঠিয়েছেন, যা নিত্যদিনের খরচে শেষ হয়ে গেছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের ই-কেওয়াইসি (Electronic Know Your Customer - e-KYC) এবং প্রবাসী ব্যাংকিং নীতিমালার কল্যাণে ২০২৬ সালে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা ইউরোপ-আমেরিকায় বসে নিজের স্মার্টফোন দিয়ে মাত্র ১০ মিনিটে বাংলাদেশের যেকোনো তফসিলি ব্যাংকে প্রবাসী ব্যাংক একাউন্ট (NRB Probashi Account) খোলা সম্ভব।

এই পূর্ণাঙ্গ সাব-গাইডে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি প্রবাসীদের জন্য টাকা (BDT), প্রাইভেট ফরেন কারেন্সি (PFC), এনএফসিডি (NFCD) ও অফশোর ব্যাংকিং একাউন্টের পার্থক্য কী, বিদেশে বসে Sonali e-Wallet, CellFin ও BRAC Astha অ্যাপ দিয়ে কীভাবে নিজের একাউন্ট খুলবেন, সোনালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের মুনাফা ও সেবার তুলনামূলক বিশ্লেষণ, কীভাবে এনআরবি একাউন্টের মাধ্যমে ২.৫% সরকারি রেমিট্যান্স প্রণোদনা ও ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড কিনবেন এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের বিপরীতে প্রবাসী হোম লোন ও ডরম্যান্ট একাউন্ট সচল করবেন।

১. প্রবাসী একাউন্ট (NRB Account) কী এবং কেন প্রতিটি প্রবাসীর নিজের একাউন্ট থাকা জরুরি?

অনাবাসী বাংলাদেশি বা Non-Resident Bangladeshi (NRB) নাগরিকদের বৈদেশিক মুদ্রার আয় নিরাপদে দেশে পাঠানো, সঞ্চয় করা এবং বিনিয়োগের সুবিধার্থে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ (Foreign Exchange Policy Department - FEPD)-এর বিশেষ গাইডলাইনের অধীনে বাংলাদেশের তফসিলি ব্যাংকগুলো যে বিশেষায়িত ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করে, তাকে প্রবাসী ব্যাংক একাউন্ট (NRB Probashi Account) বলা হয়। দেশের সাধারণ নাগরিকদের সেভিংস একাউন্টের তুলনায় প্রবাসী একাউন্টে বেশ কিছু অনন্য রাষ্ট্রীয় ও ব্যাংকিং সুবিধা সংযুক্ত থাকে।

নিজের নামে প্রবাসী ব্যাংক একাউন্ট থাকার ৬টি অপরিহার্য সুবিধা:

  1. নিজের আয়ের ওপর শতভাগ নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা: পরিবারের মাসিক খরচের টাকা পরিবারের সদস্যের একাউন্টে বা বিকাশে পাঠালেও, নিজের ভবিষ্যৎ সঞ্চয়ের অংশটুকু নিজ নামের এনআরবি একাউন্টে জমা রাখলে প্রবাস জীবন শেষে শূন্য হাতে ফিরতে হয় না।
  2. স্বয়ংক্রিয় ২.৫% সরকারি নগদ প্রণোদনা: বিদেশ থেকে নিজের এনআরবি টাকা সেভিংস একাউন্টে রেমিট্যান্স পাঠালেও সরকার প্রদত্ত ২.৫% নগদ রেমিট্যান্স বোনাস মূল টাকার সাথে সরাসরি আপনার একাউন্টে জমা হয়।
  3. ১০০% আয়করমুক্ত রেমিট্যান্স সনদ (Tax Encashment Certificate): নিজের একাউন্টে বৈধ রেমিট্যান্স জমা হলে ব্যাংক থেকে অনলাইনে এনক্যাশমেন্ট সার্টিফিকেট ডাউনলোড করা যায়, যা দিয়ে দেশে জমি, ফ্ল্যাট বা গাড়ি কিনলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (NBR) কোনো আয়কর দিতে হয় না।
  4. ওয়েজ আর্নার বন্ড ও পেনশন স্কিমে সরাসরি অটো-ডেবিট সুবিধা: ১২% করমুক্ত মুনাফার ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড কেনা এবং সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রবাস’ স্কিমের মাসিক কিস্তি প্রদানের জন্য নিজের নামে এনআরবি বা এফসি একাউন্ট থাকা আবশ্যক।
  5. ইমেইল ও বিদেশি রোমিং নম্বরে ওটিপি (OTP) সুবিধা: সাধারণ দেশীয় একাউন্টে শুধু বাংলাদেশি সিমে ওটিপি যায়, কিন্তু প্রবাসী এনআরবি একাউন্টে আপনার ইমেইল আইডিতে (Email OTP) অথবা সৌদি, কাতার, কুয়েত বা দুবাইয়ের মোবাইল নম্বরে ওটিপি পাঠানোর ব্যবস্থা থাকে।
  6. প্রবাসী হোম লোন ও ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা: নিজের একাউন্টে টানা ১২ থেকে ২৪ মাস নিয়মিত রেমিট্যান্স প্রবাহের রেকর্ড থাকলে ব্যাংকগুলো সহজেই ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত গৃহনির্মাণ ঋণ (NRB Home Loan) অনুমোদন করে।

২. প্রবাসী ব্যাংক হিসাবের ৪টি ধরন: NRB টাকা সেভিংস, ফরেন কারেন্সি (PFC), NFCD ও অফশোর

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রবাসীরা তাঁদের আয়ের ধরন এবং মুদ্রার পছন্দ অনুযায়ী প্রধানত ৪ ধরনের প্রবাসী একাউন্ট খুলতে পারেন। একাউন্ট খোলার আগে কোন হিসাবটি আপনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত তা নিচের টেবিল থেকে বুঝে নিন:

বাংলাদেশে প্রবাসীদের জন্য এনআরবি সেভিংস এবং ফরেন কারেন্সি একাউন্টের ধরন
চিত্র ২: প্রবাসীদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত এনআরবি টাকা সেভিংস, প্রাইভেট ফরেন কারেন্সি (PFC), এনএফসিডি এবং অফশোর ব্যাংকিং হিসাবের কাঠামো
প্রবাসী একাউন্টের ধরন হিসাবের মুদ্রা (Currency) ২.৫% সরকারি বোনাস ও মুনাফার হার টাকা উত্তোলন ও বিশেষ সুবিধা
১. এনআরবি টাকা সেভিংস / মুদারাবা একাউন্ট (NRB BDT Account) বাংলাদেশি টাকা (BDT) ২.৫% নগদ সরকারি বোনাস প্রযোজ্য + ব্যাংক মুনাফা ৪.৫% থেকে ৭.৫% (ডিপিএসে ৮%–১০%) দেশে এটিএম কার্ড, চেক বই ও মোবাইল অ্যাপ দিয়ে যেকোনো সময় টাকায় উত্তোলন ও বিকাশ/নগদে ফান্ড ট্রান্সফার
২. প্রাইভেট ফরেন কারেন্সি একাউন্ট (PFC Account) USD, GBP, EUR, CAD, AUD, JPY, SAR, QAR, AED বৈদেশিক মুদ্রায় বার্ষিক ৪% থেকে ৬.৫% মুনাফা (যখন টাকায় ভাঙাবেন তখন ২.৫% বোনাস প্রাপ্য) টাকা অবমূল্যায়নের ঝুঁকি থাকে না; ইন্টারন্যাশনাল ডেবিট কার্ড দিয়ে বিদেশেও ডলার খরচ বা উত্তোলন করা যায়
৩. নন-রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট (NFCD Account) USD, GBP, EUR (মেয়াদী আমানত বা FDR) ১ মাস থেকে ৩ বছর মেয়াদে বার্ষিক ৫.৫% থেকে ৭.৫% করমুক্ত বৈদেশিক মুদ্রা মুনাফা মেয়াদ শেষে আসল ও মুনাফাসহ পুরো ডলার বিদেশে ফেরত নেওয়া (Repatriate) বা টাকায় নগদায়ন করা যায়
৪. অফশোর ব্যাংকিং ডিপোজিট (OBU Account) USD, EUR, GBP (অফশোর ব্যাংকিং আইন ২০২৪) আন্তর্জাতিক SOFR/EURIBOR প্লাস প্রিমিয়াম রেটে ৬.৫% থেকে ৮.৫% সম্পূর্ণ করমুক্ত মুনাফা কোনো ফরেন এক্সচেঞ্জ কন্ট্রোল ছাড়াই যেকোনো সময় বিদেশে টাকা ফেরত নেওয়ার অবারিত স্বাধীনতা

৩. বিদেশে বসে অনলাইনে (e-KYC অ্যাপে) প্রবাসী ব্যাংক একাউন্ট খোলার ধাপে ধাপে নিয়ম

২০২৬ সালে প্রবাসে বসে বাংলাদেশি ব্যাংক একাউন্ট খোলার জন্য আর দূতাবাসে গিয়ে কাগজ সত্যায়িত করে কুরিয়ারে পাঠাতে হয় না। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি শীর্ষ ব্যাংক তাদের মোবাইল অ্যাপে ডিজিটাল ই-কেওয়াইসি (e-KYC) ও অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন (OCR) প্রযুক্তি যুক্ত করেছে। নিচে বিদেশে বসে স্মার্টফোন দিয়ে মাত্র ১০ মিনিটে একাউন্ট খোলার ৭টি সর্বজনীন ধাপ তুলে ধরা হলো:

বিদেশে বসে অনলাইনে প্রবাসী ব্যাংক একাউন্ট খোলার নিয়ম ও ই কেওয়াইসি
চিত্র ৩: প্রবাসে বসে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পাসপোর্ট ও এনআইডি স্ক্যান এবং লাইভ সেলফি দিয়ে ১০ মিনিটে ই-কেওয়াইসি ব্যাংক একাউন্ট খোলার ধাপ
  1. ধাপ ১ — অফিশিয়াল ব্যাংকিং অ্যাপ ডাউনলোড বা ওয়েব পোর্টালে প্রবেশ: গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপল অ্যাপ স্টোর থেকে আপনার পছন্দের ব্যাংকের অফিশিয়াল অ্যাপ (যেমন—সোনালী ব্যাংকের Sonali e-Wallet / e-Sheba, ইসলামী ব্যাংকের CellFin, ব্র্যাক ব্যাংকের BRAC Bank Astha / Shumonto, সিটি ব্যাংকের Ekhoni Account বা ইস্টার্ন ব্যাংকের EBL Self-Service) ডাউনলোড করুন।
  2. ধাপ ২ — ‘NRB / Expatriate Account’ অপশন নির্বাচন ও ইমেইল/মোবাইল ভেরিফিকেশন: অ্যাপ ওপেন করে ‘Open New Account’ থেকে ‘NRB Account (For Expatriates Abroad)’ নির্বাচন করুন। এরপর আপনার সচল ইমেইল অ্যাড্রেস এবং প্রবাসের মোবাইল নম্বর (কান্ট্রি কোডসহ, যেমন সৌদি +966, কাতার +974, কুয়েত +965, ইউএই +971) প্রদান করলে আপনার ইমেইলে একটি ৬ সংখ্যার ওটিপি (OTP) কোড আসবে। সেটি দিয়ে ভেরিফাই করুন।
  3. ধাপ ৩ — জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা পাসপোর্ট ওসিআর (OCR) স্ক্যান: ফোনের ক্যামেরা দিয়ে আপনার বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রের (Smart NID) উভয় পাশ অথবা ই-পাসপোর্টের তথ্য পাতার ছবি তুলুন। অ্যাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার নাম, পিতা-মাতার নাম ও জন্ম তারিখ নির্বাচন কমিশনের (EC) সার্ভার থেকে মিলিয়ে নেবে।
  4. ধাপ ৪ — লাইভ সেলফি বা ফেসিয়াল বায়োমেট্রিক যাচাই (Liveness Check): পর্যাপ্ত আলোতে ফোনের ফ্রন্ট ক্যামেরার সামনে তাকিয়ে অ্যাপের নির্দেশনা অনুযায়ী চোখের পলক ফেলুন (Blink Eyes) বা মুখ সামান্য ঘোরান। এটি আপনার এনআইডি বা পাসপোর্টের ছবির সাথে লাইভ চেহারা মিলিয়ে তাৎক্ষণিক কেওয়াইসি সম্পন্ন করবে।
  5. ধাপ ৫ — প্রবাসের ভিসা, আকামা ও আয়ের উৎস আপলোড: আপনি কোন দেশে আছেন, আপনার আকামা/QID/Civil ID/Work Permit-এর ছবি এবং আপনার পেশা বা মাসিক সম্ভাব্য রেমিট্যান্সের পরিমাণ সিলেক্ট করুন।
  6. ধাপ ৬ — নমিনি (Nominee) সংযুক্তকরণ ও ডিজিটাল স্বাক্ষর: আপনার অবর্তমানে একাউন্টের টাকা কে পাবেন (স্ত্রী, সন্তান বা পিতা-মাতা), তাঁর নাম, এনআইডি নম্বর ও ছবি এবং একটি সাদা কাগজে আপনার স্বাক্ষর করে তার ছবি আপলোড করুন।
  7. ধাপ ৭ — তাৎক্ষণিক একাউন্ট নম্বর প্রাপ্তি ও প্রথম রেমিট্যান্স জমা: সাবমিট করার সাথে সাথেই আপনার ইমেইল ও স্ক্রিনে ১৩ থেকে ১৭ ডিজিটের প্রবাসী ব্যাংক একাউন্ট নম্বর, শাখার নাম, রাউটিং নম্বর ও সুইফট কোড (SWIFT Code) চলে আসবে! এরপর বিদেশের যেকোনো এক্সচেঞ্জ হাউজ বা মোবাইল অ্যাপ থেকে ওই একাউন্ট নম্বরে প্রথম রেমিট্যান্স পাঠালেই একাউন্টটি পূর্ণাঙ্গভাবে সক্রিয় হয়ে যাবে।

৪. সোনালী, ইসলামী, ব্র্যাক, সিটি ও অগ্রণী ব্যাংকের প্রবাসী একাউন্টের তুলনামূলক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স ও ব্যাংকিং সেবায় সরকারি এবং বেসরকারি উভয় খাতের ব্যাংকগুলোই প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু কোন ব্যাংকটি আপনার পরিবারের অবস্থান এবং আপনার ডিজিটাল ব্যাংকিং প্রয়োজনের জন্য সেরা? নিচে ২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশের শীর্ষ ৬টি প্রবাসী-বান্ধব ব্যাংকের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

সোনালী ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক এবং ব্র্যাক ব্যাংক প্রবাসী একাউন্ট তুলনা
চিত্র ৪: সোনালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের প্রবাসী একাউন্ট সুবিধা ও অ্যাপ ফিচারের তুলনা
ব্যাংকের নাম প্রবাসী একাউন্টের নাম ও ধরন মোবাইল অ্যাপ ও ইমেইল OTP সুবিধা শাখা ও এটিএম নেটওয়ার্ক প্রধান আকর্ষণ ও বিশেষ সুবিধা
১. সোনালী ব্যাংক পিএলসি (Sonali Bank PLC)
(সরকারি ব্যাংক)
Sonali NRB Deposit Account & Wage Earner Account Sonali e-Wallet ও Sonali e-Sheba (বিদেশ থেকে একাউন্ট খোলা ও পরিচালনা) সারা দেশে ১,২৩০+ শাখা (ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে বিস্তৃত) শতভাগ সরকারি গ্যারান্টি, ওয়েজ আর্নার বন্ড কেনা সবচেয়ে সহজ এবং গ্রামের পরিবারের টাকা তুলতে কোনো ঝামেলা নেই
২. ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ (IBBL)
(শরিয়াহ ব্যাংক)
Mudaraba Expatriate / Probashi Savings & MSS (DPS) CellFin (সেলফিন) ও iBanking (ইমেইল ও বিদেশি নম্বরে OTP সুবিধা) ৪০০+ শাখা, ২৫০+ উপশাখা ও ২,৭০০+ এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট সুদমুক্ত শরিয়াহ মুনাফা, মধ্যপ্রাচ্যের সকল এক্সচেঞ্জ হাউজে নিজস্ব প্রতিনিধি এবং দ্রুততম রেমিট্যান্স ক্যাশ পেমেন্ট
৩. ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি (BRAC Bank PLC)
(বেসরকারি ব্যাংক)
BRAC Bank Probashi Savers, Probashi DPS & PFC Account BRAC Bank Astha (আস্থা) অ্যাপ (ইমেইল ওটিপি ও সম্পূর্ণ ফি-মুক্ত অ্যাপ ব্যাংকিং) ১৮৭+ শাখা, ৪০+ উপশাখা ও ১,০০০+ এজেন্ট ব্যাংকিং পয়েন্ট অ্যাপের ভেতরেই ১ ক্লিকে প্রবাসী ডিপিএস/এফডিআর খোলা, প্রবাসী হোম লোন এবং জিরো অ্যাকাউন্ট মেইনটেন্যান্স ফি সুবিধা
৪. সিটি ব্যাংক পিএলসি (City Bank PLC) City NRB Savings, Islamic NRB & Offshore Deposit Citytouch (সিটিটাচ) অ্যাপ (আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল ব্যাংকিং) ১৩৫+ শাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক প্রবাসী ফরেন কারেন্সি একাউন্ট, আমেরিকান এক্সপ্রেস (Amex) কার্ড এবং দ্রুততম এনআরবি হোম লোন প্রসেসিং
৫. অগ্রণী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক
(সরকারি ব্যাংক)
Agrani Probashi / Duar Banking & Janata NRB Account Agrani Smart App ও eJanata অ্যাপ ৯৭০+ শাখা (দেশের প্রতিটি হাট-বাজারে শাখা বিদ্যমান) প্রবাসী রেমিট্যান্সে কখনো কখনো সরকারি ২.৫% বোনাসের পাশাপাশি ব্যাংকের নিজস্ব স্পেশাল এক্সচেঞ্জ রেট অফার
৬. ডাচ্-বাংলা ব্যাংক (DBBL) DBBL NRB Savings & Rocket Remittance Account NexusPay (নেক্সাস পে) ও Rocket অ্যাপ দেশের বৃহত্তম এটিএম (৫,০০০+ ATM/CRM) ও ফাস্ট ট্র্যাক নেটওয়ার্ক পরিবারের সদস্যরা ব্যাংকের লাইনে না দাঁড়িয়ে ২৪ ঘণ্টা এটিএম বুথ থেকেই রেমিট্যান্সের টাকা তুলতে পারেন

৫. Sonali e-Wallet, CellFin ও BRAC Astha অ্যাপে বিদেশ থেকে ডিপিএস (DPS) ও FDR পরিচালনা

একবার আপনার প্রবাসী এনআরবি একাউন্ট চালু হয়ে গেলে আপনাকে আর কোনো কাজের জন্য দেশে থাকা আত্মীয়স্বজনের ওপর নির্ভর করতে হবে না। ব্যাংকের অফিসিয়াল মোবাইল অ্যাপ (যেমন—BRAC Astha, CellFin, Citytouch বা Sonali e-Wallet) আপনার স্মার্টফোনে লগইন করে বিদেশে বসেই নিচের ৫টি ব্যাংকিং সেবা ২৪ ঘণ্টা পরিচালনা করতে পারবেন:

বিদেশ থেকে সোনালী ই ওয়ালেট সেলফিন ও আস্থা অ্যাপ ব্যবহারের নিয়ম
চিত্র ৫: প্রবাসে বসেই মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপে ইমেইল ওটিপি (OTP) দিয়ে প্রবাসী ডিপিএস, এফডিআর এবং বিকাশ/নগদে তাৎক্ষণিক ফান্ড ট্রান্সফার
  • বিদেশে বসে ১ মিনিটে প্রবাসী ডিপিএস (DPS) ও এফডিআর (FDR) খোলা: আপনার মূল সেভিংস একাউন্টে রেমিট্যান্স জমা হওয়ার পর অ্যাপের ভেতর থেকে নিজেই মাসিক ১,০০০ টাকা থেকে ৫০,০০০ টাকার প্রবাসী ডিপিএস (বার্ষিক ৮.৫% থেকে ১০% মুনাফায়) কিংবা ১ লাখ বা ৫ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট (FDR) খুলতে পারবেন। মেয়াদ শেষে আসল ও মুনাফা আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার মূল একাউন্টে চলে আসবে।
  • ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ (NPSB / BEFTN) দিয়ে যেকোনো ব্যাংকে বা বিকাশে টাকা পাঠানো: আপনার নিজের এনআরবি একাউন্টে পুরো বেতন পাঠিয়ে রাখুন। এরপর যখনই বাড়িতে মা-বাবা বা স্ত্রীর টাকার প্রয়োজন হবে, অ্যাপ থেকে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে দেশের যেকোনো ব্যাংকের একাউন্টে অথবা সরাসরি তাঁদের বিকাশ/নগদ নম্বরে প্রয়োজনীয় অংশটুকু ট্রান্সফার করে দিন।
  • বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল ও সন্তানের স্কুল/কলেজ ফি পরিশোধ: অ্যাপের ইউটিলিটি বিল পেমেন্ট অপশন থেকে বিদেশে বসেই গ্রামের বাড়ির পল্লী বিদ্যুৎ বিল, ডেসকো/ডিপিডিসি বিল এবং সন্তানদের টিউশন ফি সরাসরি পরিশোধ করা যায়।

৬. প্রবাসী ব্যাংক একাউন্ট খুলতে কী কী কাগজপত্র লাগে? (চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী চেকলিস্ট)

আপনি অনলাইনে ই-কেওয়াইসি অ্যাপে একাউন্ট খুলুন অথবা বিদেশের এক্সচেঞ্জ হাউজের এনআরবি ডেস্কে গিয়ে ফরম পূরণ করুন—বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ (BFIU) নির্দেশনা অনুযায়ী নিচের ডকুমেন্টগুলোর পরিষ্কার ছবি বা পিডিএফ কপি সাথে রাখতে হবে:

প্রবাসী ব্যাংক একাউন্ট খুলতে কি কি কাগজপত্র লাগে তার তালিকা
চিত্র ৬: প্রবাসী এনআরবি একাউন্ট খোলার জন্য পাসপোর্ট, এনআইডি, বৈধ ভিসা/আকামা, আয়ের প্রমাণপত্র ও নমিনির ডকুমেন্ট চেকলিস্ট
ডকুমেন্টের নাম চাকরিজীবী প্রবাসীদের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী / আত্মকর্মসংস্থানকারী প্রবাসীদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
১. পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট মেয়াদযুক্ত বাংলাদেশি পাসপোর্ট (তথ্য পাতা) এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (NID / Smart Card) মেয়াদযুক্ত বাংলাদেশি পাসপোর্ট (বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ডুয়াল সিটিজেনশিপ/NVR) ও এনআইডি ই-কেওয়াইসি অ্যাপে একাউন্ট খুলতে এনআইডি কার্ড থাকা সবচেয়ে সুবিধাজনক
২. প্রবাসে অবস্থানের বৈধ প্রমাণ বৈধ ওয়ার্ক ভিসা কপি এবং সংশ্লিষ্ট দেশের রেসিডেন্স কার্ড (Iqama / QID / Civil ID / Work Permit) বিদেশের ইনভেস্টর ভিসা, পার্টনার ভিসা বা রেসিডেন্স পারমিট কার্ডের উভয় পাশের ছবি ভিসা বা আকামার মেয়াদ সচল থাকতে হবে
৩. আয়ের উৎস বা পেশার প্রমাণ (Source of Fund) চাকরির চুক্তিপত্র (Job Contract), কোম্পানির আইডি কার্ড, স্যালারি সার্টিফিকেট অথবা বিএমইটি স্মার্ট কার্ড বিদেশের ট্রেড লাইসেন্স (Commercial Registration - CR), ট্যাক্স কপি বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট সাধারণ ওয়েজ আর্নার সেভিংস একাউন্টে বিএমইটি কার্ড বা আকামাই আয়ের প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট
৪. নমিনি (Nominee) সংক্রান্ত কাগজ নমিনির এনআইডি কার্ড বা জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং ১ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি নমিনির এনআইডি কার্ড বা জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং ১ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি একাধিক নমিনি রাখা যায় এবং প্রত্যেকের শতকরা হার (যেমন ৫০% + ৫০%) নির্ধারণ করা যায়

৭. এনআরবি একাউন্টে ২.৫% সরকারি বোনাস, করমুক্ত মুনাফা ও রেমিট্যান্স সার্টিফিকেট সুবিধা

অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে—অন্যের নামে পিন ক্যাশে বা বিকাশে টাকা পাঠালে ২.৫% সরকারি প্রণোদনা পাওয়া যায়, কিন্তু নিজের ব্যাংক একাউন্টে টাকা পাঠালে হয়তো বোনাস পাওয়া যায় না। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা! বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, একজন প্রবাসী কর্মী যখন বিদেশের বৈধ মানি এক্সচেঞ্জ বা ব্যাংক থেকে বাংলাদেশে তাঁর নিজ নামের এনআরবি টাকা সেভিংস একাউন্টে (NRB BDT Account) রেমিট্যান্স পাঠান, তখনও তিনি সমানভাবে ২.৫% নগদ সরকারি প্রণোদনা লাভ করেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত নিয়ম আমাদের রেমিট্যান্স প্রণোদনা ২০২৬: ২.৫% প্রণোদনা কি, কত পাবেন ও না পেলে করণীয় গাইডে দেওয়া হয়েছে।

প্রবাসী একাউন্টে ২.৫ শতাংশ বোনাস এবং আয়করমুক্ত রেমিট্যান্স সনদ
চিত্র ৭: নিজের এনআরবি ব্যাংক একাউন্টে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে ২.৫% নগদ সরকারি বোনাস এবং আয়করমুক্ত এনক্যাশমেন্ট সনদ প্রাপ্তি

এছাড়াও প্রতিদিন বিদেশ থেকে নিজের একাউন্টে টাকা পাঠানোর আগে কোন ব্যাংকে বা এক্সচেঞ্জ হাউজে আজকের টাকার রেট সবচেয়ে বেশি চলছে তা রিয়েল-টাইমে তুলনা করার জন্য আপনার স্মার্টফোনে Taka Rate Today অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন। নিজের একাউন্টে জমা হওয়া প্রতিটি রেমিট্যান্সের বিপরীতে আপনি ব্যাংকের অ্যাপ থেকে বা শাখা থেকে Remittance Encashment Certificate (রেমিট্যান্স সনদ) সংগ্রহ করতে পারবেন, যা আপনার আয়কর ফাইলে বৈধ করমুক্ত আয় হিসেবে প্রদর্শিত হবে।

৮. প্রবাসী একাউন্টের মাধ্যমে ওয়েজ আর্নার বন্ড, ডলার বন্ড ও শেয়ার বাজার IPO ক্রয়

আপনার যদি সোনালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক বা অগ্রণী ব্যাংকের কোনো অনুমোদিত ডিলার বা এডি (Authorized Dealer - AD) শাখায় একটি এনআরবি টাকা একাউন্ট অথবা ফরেন কারেন্সি (PFC) একাউন্ট থাকে, তবে আপনি বিদেশে বসেই সরকারের সবচেয়ে লাভজনক বন্ড এবং বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করতে পারবেন।

প্রবাসী ব্যাংক একাউন্ট দিয়ে ওয়েজ আর্নার বন্ড এবং শেয়ার কেনার নিয়ম
চিত্র ৮: এনআরবি ও ফরেন কারেন্সি ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে ১২% মুনাফার ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড ও ১০% সংরক্ষিত NRB IPO শেয়ার ক্রয়
  • ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড ক্রয় (বার্ষিক ১২% করমুক্ত মুনাফা): আপনার এনআরবি একাউন্টে বৈধ রেমিট্যান্সের টাকা জমা হওয়ার পর ব্যাংককে একটি ইমেইল ইনস্ট্রাকশন বা অনলাইন রিকোয়েস্ট দিলেই ব্যাংক আপনার একাউন্ট থেকে টাকা কেটে আপনার নামে ৫ বছর মেয়াদী ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড ইস্যু করে দেবে। প্রতি ৬ মাস অন্তর বন্ডের মুনাফার টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার সেই এনআরবি একাউন্টেই জমা হতে থাকবে!
  • শেয়ার বাজারে নিটা (NITA) ও বিও (BO) একাউন্ট খুলে ১০% NRB IPO কোটায় আবেদন: প্রবাসীরা তাঁদের এনআরবি ব্যাংক হিসাবের সাথে যুক্ত করে একটি Non-Resident Investor's Taka Account (NITA) এবং ব্রোকারেজ হাউজে বিও (BO) একাউন্ট খুলতে পারেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে যত নতুন কোম্পানি শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হয়, তাদের সংরক্ষিত ১০% প্রবাসী আইপিও (NRB IPO) কোটায় আবেদন করে নিশ্চিত প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার বরাদ্দ পাওয়া যায়।

৯. প্রবাসী একাউন্টের বিপরীতে বাড়ি নির্মাণ ও ফ্ল্যাট কেনার গৃহঋণ (NRB Home Loan)

প্রবাসীদের জীবনের অন্যতম বড় স্বপ্ন হলো দেশে একটি সুন্দর পাকা বাড়ি নির্মাণ করা অথবা ঢাকা, চট্টগ্রাম বা জেলা শহরে একটি রেডি ফ্ল্যাট কেনা। কিন্তু এককালীন ৫০ লাখ বা ১ কোটি টাকা জমানোর অপেক্ষায় থাকতে গিয়ে অনেকের পুরো প্রবাস জীবনই শেষ হয়ে যায়, এদিকে রড-সিমেন্ট ও জমির দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। আপনার যদি নিজের নামে একটি প্রবাসী ব্যাংক একাউন্ট থাকে এবং সেখানে প্রতি মাসে নিয়মিত বৈধ রেমিট্যান্স পাঠানোর রেকর্ড (Bank Statement) থাকে, তবে আপনি সহজেই প্রবাসী গৃহনির্মাণ ঋণ (NRB Home Loan) পেতে পারেন।

প্রবাসী ব্যাংক একাউন্টের বিপরীতে হোম লোন ও বাড়ি নির্মাণের ঋণ
চিত্র ৯: প্রবাসী এনআরবি একাউন্টে নিয়মিত রেমিট্যান্স প্রবাহের ভিত্তিতে বাড়ি নির্মাণ ও ফ্ল্যাট ক্রয়ের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ব্যাংক হোম লোন সুবিধা
প্রবাসী হোম লোনের বৈশিষ্ট্য সরকারি ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক বেসরকারি ব্যাংক (ব্র্যাক, সিটি, ইসলামী, ডিবিবিএল)
১. ঋণের সর্বোচ্চ সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ১০ লাখ টাকা থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত (সম্পত্তির মূল্যের ৭০%–৮০%)
২. ন্যূনতম বৈধ রেমিট্যান্স রেকর্ড এনআরবি একাউন্টে কমপক্ষে ১২ মাসের নিয়মিত রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রবাসে ন্যূনতম ২ বছর চাকরির অভিজ্ঞতা ও ১২–২৪ মাসের রেমিট্যান্স স্টেটমেন্ট
৩. পরিশোধের মেয়াদ ও কিস্তি ৫ বছর থেকে ১৫ বছর (মাসিক রেমিট্যান্স থেকে অটো-ডেবিট কিস্তি) ৫ বছর থেকে ২০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী ইএমআই (EMI) সুবিধা
৪. দেশে সহ-আবেদনকারী (Co-Applicant) স্ত্রী, পিতা-মাতা বা ভাই-বোনকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও সহ-আবেদনকারী রাখা যায় দেশে অবস্থানরত নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে ফাইল প্রসেসিং ও দলিল রেজিস্ট্রেশন সুবিধা

১০. বন্ধ বা ডরম্যান্ট (Dormant) একাউন্ট সচল করা, ইমেইল OTP ও এক্সচেঞ্জ হাউজ হেল্পডেস্ক

প্রবাসীদের ব্যাংক একাউন্ট নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে দুটি কারিগরি সমস্যা দেখা দেয় তা হলো—প্রথমত, দেশ থেকে খুলে যাওয়া সাধারণ একাউন্টে ৬ মাস বা ১ বছর লেনদেন না করায় একাউন্টটি ডরম্যান্ট (Dormant / Inactive) হয়ে যাওয়া; এবং দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশি সিম কার্ডটি প্রবাসে যাওয়ার পর রোমিং না থাকায় বন্ধ হয়ে গিয়ে অ্যাপের ওটিপি (OTP) না আসা। ২০২৬ সালে এই দুটি সমস্যারই স্থায়ী ডিজিটাল সমাধান রয়েছে।

প্রবাসে থেকে বন্ধ বা ডরম্যান্ট ব্যাংক একাউন্ট সচল করার নিয়ম
চিত্র ১০: বিদেশে বসেই ভিডিও কল ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে ডরম্যান্ট ব্যাংক একাউন্ট সচল করা এবং ইমেইল ওটিপি (Email OTP) চালু করার নিয়ম
বিদেশের মানি এক্সচেঞ্জ হাউজ থেকে বাংলাদেশের প্রবাসী একাউন্ট খোলার নিয়ম
চিত্র ১১: সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ার মানি এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোতে অবস্থিত বাংলাদেশি ব্যাংকের এনআরবি হেল্পডেস্ক সেবা

প্রবাসে বসে ডরম্যান্ট একাউন্ট সচল ও ওটিপি সমস্যার সমাধান:

  1. ইমেইল ওটিপি (Email OTP) ও বায়োমেট্রিক টু-ফ্যাক্টর চালু করা: বিদেশে যাওয়ার আগে বা প্রবাসে বসে একাউন্ট খোলার সময় ব্যাংকের কাস্টমার কেয়ারে (২৪/৭ কল সেন্টার বা ভেরিফাইড ইমেইলে) রিকোয়েস্ট দিয়ে আপনার ওটিপি চ্যানেল হিসেবে ‘SMS to Email Change’ অথবা ইন্টারন্যাশনাল নাম্বার রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করে নিন। ব্র্যাক ব্যাংকের আস্থা, ইসলামী ব্যাংকের সেলফিন ও সিটি ব্যাংকের সিটিটাচ অ্যাপে ইমেইল ওটিপি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে কাজ করে।
  2. ভিডিও কেওয়াইসি (Video KYC) দিয়ে ডরম্যান্ট একাউন্ট সক্রিয়করণ: আপনার একাউন্টে টাকা জমা (Credit) হওয়া কখনো বন্ধ হয় না, কিন্তু দীর্ঘদিন টাকা উত্তোলন (Debit) না করলে একাউন্টটি নিরাপত্তার স্বার্থে ডরম্যান্ট হয়ে যায়। এটি সচল করতে দেশে আসার প্রয়োজন নেই—ব্যাংকের ডেডিকেটেড NRB Helpdesk ইমেইলে আপনার পাসপোর্ট ও বর্তমান ভিসা/আকামার কপি পাঠিয়ে আবেদন করলে ব্যাংক অফিসার হোয়াটসঅ্যাপ বা জুম ভিডিও কলের মাধ্যমে আপনার পরিচয় নিশ্চিত করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একাউন্টটি পুনরায় সচল (Active) করে দেবেন।
  3. বিদেশের এক্সচেঞ্জ হাউজে বাংলাদেশি ব্যাংকের সরাসরি প্রতিনিধি ডেস্ক: সৌদি আরবের আল রাজি ও ফাওরি, কাতারের আল মিরকাব ও আল দার, কুয়েতের আল মোল্লা ও বিইসি, আরব আমিরাতের আল আনসারী ও লুলু এক্সচেঞ্জ এবং মালয়েশিয়ার অগ্রণী রেমিট্যান্স ও মার্চেন্ট্রেড শাখাগুলোতে সোনালী, ইসলামী, অগ্রণী ও ব্র্যাক ব্যাংকের নিজস্ব বাংলাদেশি অফিসার বসেন। আপনি ছুটির দিনে সরাসরি সেখানে গিয়েও নতুন প্রবাসী একাউন্ট খোলা বা চেক বই/কার্ডের আবেদন করতে পারেন।

প্রবাসী ডিপিএস (NRB DPS) ও এফডিআর (FDR) লাভের হিসাব: ৫ ও ১০ বছরে কত টাকা জমে?

অনেক প্রবাসী ভাই-বোন প্রতি মাসে বেতন পাওয়ার পর যদি মাত্র ৫,০০০ টাকা বা ১০,০০০ টাকা নিজের এনআরবি একাউন্টের মাধ্যমে একটি মাসিক প্রবাসী সঞ্চয় প্রকল্পে (NRB Monthly DPS / Mudaraba Special Savings) জমা রাখেন, তবে ৫ বছর বা ১০ বছর পর চক্রবৃদ্ধি মুনাফাসহ সেটি একটি বিশাল তহবিলে পরিণত হয়। ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে প্রবাসী ডিপিএসের ওপর বার্ষিক ৮.৫০% থেকে ১০.০০% পর্যন্ত মুনাফা প্রদান করা হচ্ছে। নিচে মাসিক কিস্তির বিপরীতে মেয়াদান্তে প্রাপ্ত সম্ভাব্য তহবিলের হিসাব দেখানো হলো:

মাসিক ডিপিএস কিস্তি (BDT) ৫ বছরে আপনার মোট জমা (আসল) ৫ বছর শেষে মুনাফাসহ প্রাপ্ত টাকা (আনুমানিক ৯% হারে) ১০ বছরে আপনার মোট জমা (আসল) ১০ বছর শেষে মুনাফাসহ প্রাপ্ত টাকা (আনুমানিক ৯.৫% হারে)
৩,০০০ টাকা / মাস ১,৮০,০০০ টাকা ২,২৬,০০০+ টাকা ৩,৬০,০০০ টাকা ৫,৯০,০০০+ টাকা
৫,০০০ টাকা / মাস ৩,০০,০০০ টাকা ৩,৭৭,০০০+ টাকা ৬,০০,০০০ টাকা ৯,৮৫,০০০+ টাকা
১০,০০০ টাকা / মাস ৬,০০,০০০ টাকা ৭,৫৫,০০০+ টাকা ১২,০০,০০০ টাকা ১৯,৭০,০০০+ টাকা
২০,০০০ টাকা / মাস ১২,০০,০০০ টাকা ১৫,১০,০০০+ টাকা ২৪,০০,০০০ টাকা ৩৯,৪০,০০০+ টাকা
২৫,০০০ টাকা / মাস ১৫,০০,০০০ টাকা ১৮,৮৮,০০০+ টাকা ৩০,০০,০০০ টাকা ৪৯,২৫,০০০+ টাকা

প্রবাস থেকে নিজের একাউন্টে সরাসরি রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রধান ব্যাংকগুলোর সুইফট কোড (SWIFT Code) ও হেল্পডেস্ক তালিকা:

বিদেশের ব্যাংক একাউন্ট, মোবাইল মানি অ্যাপ (যেমন—STC Pay, Urpay, Ooredoo Money, CBQ, Al Mulla App, Botim, Wise বা Remitly) অথবা মানি এক্সচেঞ্জ থেকে বাংলাদেশে আপনার নিজ নামের এনআরবি একাউন্টে সরাসরি একাউন্ট ক্রেডিট (Account Deposit / BEFTN) করার সময় ব্যাংকের ইংরেজি বানান, রাউটিং নম্বর এবং সুইফট কোড (SWIFT / BIC Code) প্রয়োজন হয়। নিচে প্রবাসীদের সর্বাধিক ব্যবহৃত ব্যাংকগুলোর অফিশিয়াল সুইফট কোড ও ২৪ ঘণ্টা এনআরবি হেল্পডেস্ক ইমেইল দেওয়া হলো:

ব্যাংকের নাম অফিশিয়াল SWIFT Code প্রবাসী এনআরবি হেল্পডেস্ক ইমেইল ও কল সেন্টার বিদেশ থেকে অ্যাপ ব্যবহারের পোর্টাল
১. সোনালী ব্যাংক পিএলসি BSONBDDH remittance@sonalibank.com.bd / কল সেন্টার: ১৬৬৩৯ Sonali e-Wallet / Sonali e-Sheba
২. ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ IBBLBDDH overseas@islamibankbd.com / কল সেন্টার: ১৬২৫৯ CellFin App & iBanking Portal
৩. ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি BRAKBDDH nrbbanking@bracbank.com / কল সেন্টার: ১৬২২১ BRAC Bank Astha & Probashi Hub
৪. সিটি ব্যাংক পিএলসি CIBLBDDH nrb@thecitybank.com / কল সেন্টার: ১৬২৩৪ Citytouch Digital Banking
৫. অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি AGBKBDDH remittance@agranibank.org / কল সেন্টার: ১৬৭৩৮ Agrani Smart Banking App
৬. ডাচ্-বাংলা ব্যাংক (DBBL) DBBLBDDH nrb@dutchbanglabank.com / কল সেন্টার: ১৬২১৬ NexusPay & Rocket Remittance
৭. ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (EBL) EBLDBDDH nrb@ebl-bd.com / কল সেন্টার: ১৬২৩০ EBL Skybanking App

একক একাউন্ট বনাম যৌথ একাউন্ট (Joint Account) ও ম্যান্ডেট হোল্ডার (Mandate Holder) রাখার নিয়ম:

প্রবাসীরা দেশে বা বিদেশে বসে ব্যাংক একাউন্ট খোলার সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন—হিসাবটি কি শুধুমাত্র নিজের একক নামে (Single Account) খুলবেন, নাকি স্ত্রী বা বাবা-মায়ের সাথে যৌথ নামে (Joint Account) খুলবেন? বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী নিচে দুটি পদ্ধতির সুবিধা ও সতর্কতা ব্যাখ্যা করা হলো:

  • একক এনআরবি একাউন্টে ম্যান্ডেট হোল্ডার (Operating Mandate) সুবিধা: আপনি যদি চান একাউন্টের শতভাগ মালিকানা শুধুমাত্র আপনার নিজের নামে থাকবে, কিন্তু জরুরি প্রয়োজনে দেশে থাকা আপনার স্ত্রী বা পিতা চেক দিয়ে শাখা থেকে টাকা তুলতে পারবেন, তবে যৌথ একাউন্ট খোলার দরকার নেই। আপনি নিজের একক এনআরবি একাউন্টে একটি ‘ম্যান্ডেট ফরম’ (Mandate Authorization Form) পূরণ করে দেশে থাকা যেকোনো একজন বিশ্বস্ত সদস্যকে একাউন্ট অপারেট করার ক্ষমতা দিতে পারেন। আবার আপনি যেকোনো সময় বিদেশ থেকে এক ইমেইলেই সেই ম্যান্ডেট বাতিলও করতে পারবেন।
  • ‘Either or Survivor’ যৌথ একাউন্টের সতর্কতা: আপনি যদি কারও সাথে ‘Either or Survivor’ (যেকোনো একজন স্বাক্ষর করে সব টাকা তুলতে পারবেন) শর্তে যৌথ একাউন্ট খোলেন, তবে দ্বিতীয় ব্যক্তি আপনার অনুমতি ছাড়াই পুরো জমানো টাকা উত্তোলন বা এফডিআর ভেঙে ফেলতে পারবেন। তাই প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ কৌশল হলো—নিজের নামে একটি একক এনআরবি একাউন্ট ও অ্যাপ রাখা এবং পরিবারের খরচের জন্য স্ত্রীর বা মা-বাবার নামে আলাদা একটি সেভিংস একাউন্ট বা বিকাশ ওয়ালেট ব্যবহার করা।
  • নমিনি (Nominee) ও নাবালক সন্তানের সুরক্ষা: আপনার একক প্রবাসী একাউন্টে অবশ্যই আপনার স্ত্রী, সন্তান ও পিতা-মাতাকে সুনির্দিষ্ট শতকরা হারে (যেমন—স্ত্রী ৪০%, সন্তান ৪০%, মাতা ২০%) নমিনি হিসেবে যুক্ত করুন। নমিনি যদি ১৮ বছরের কম বয়সী (নাবালক) সন্তান হয়, তবে ফরমে একজন আইনগত অভিভাবকের (Guardian) নাম উল্লেখ করে দিন।

প্রবাসে বসে ব্যাংকিং নিরাপত্তা ও সাইবার জালিয়াতি প্রতিরোধে ৭টি গোল্ডেন রুল:

  1. কখনোই ফোনে বা হোয়াটসঅ্যাপে ওটিপি (OTP) ও পিন শেয়ার করবেন না: বাংলাদেশের কোনো ব্যাংকের কর্মকর্তা কখনোই আপনাকে কল করে আপনার অ্যাপের পাসওয়ার্ড, ইমেইল ওটিপি বা কার্ডের সিভিভি (CVV) নম্বর জানতে চাইবেন না। কেউ নিজেকে “ব্যাংকের হেড অফিস” বা “রেমিট্যান্স বোনাস অফিসার” পরিচয় দিয়ে ওটিপি চাইলে সাথে সাথে কল কেটে দিন।
  2. পাবলিক ওয়াই-ফাই বা ভিপিএন (VPN) চালু রেখে ব্যাংকিং অ্যাপে লগইন করবেন না: লেবার ক্যাম্পের খোলা ওয়াই-ফাই বা ফ্রি ভিপিএন অ্যাপ চালু অবস্থায় মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপে লগইন করলে আপনার সেশন টোকেন চুরি হতে পারে কিংবা ব্যাংক নিরাপত্তার কারণে আপনার আইডি সাময়িক লক করে দিতে পারে। সর্বদা নিজের মোবাইল ডাটা ব্যবহার করে ব্যাংকিং অ্যাপ চালান।
  3. ইমেইল আইডিতে টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন (2FA) চালু রাখুন: যেহেতু প্রবাসী একাউন্টের সব ওটিপি আপনার ইমেইলে আসে, তাই আপনার জিমেইল (Gmail) বা ইমেইল একাউন্টটিই আপনার ব্যাংকের চাবি। আপনার ইমেইলে অবশ্যই শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ও টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখুন।
  4. প্রতি মাসে ই-স্টেটমেন্ট (e-Statement) ও রেমিট্যান্স ভাউচার সংরক্ষণ করুন: বিদেশ থেকে পাঠানো প্রতিটি রেমিট্যান্সের রশিদ এবং ব্যাংক থেকে প্রতি মাসে ইমেইলে আসা পিডিএফ ই-স্টেটমেন্ট গুগল ড্রাইভে একটি ফোল্ডারে সেভ করে রাখুন। ভবিষ্যতে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক লোন, হোম লোন বা আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় এই স্টেটমেন্টগুলোই আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে কাজ করবে।

প্রবাসীদের জন্য ইসলামী শরিয়াহ ব্যাংকিং (Mudaraba NRB Account) বনাম প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের পার্থক্য:

বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে সুদমুক্ত বা হালাল মুনাফার মাধ্যমে তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ সঞ্চয় করতে চান। এই চাহিদার কথা মাথায় রেখে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের পাশাপাশি সোনালী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক (BRAC Bank TARA & Agami Islamic), সিটি ব্যাংক (City Islamic) ও ইস্টার্ন ব্যাংকও প্রবাসীদের জন্য পৃথক শরিয়াহভিত্তিক ইসলামিক এনআরবি উইন্ডো (Islamic Banking Window for NRBs) চালু করেছে। নিচে শরিয়াহভিত্তিক মুদারাবা প্রবাসী একাউন্ট এবং প্রচলিত সুদভিত্তিক একাউন্টের মূল পার্থক্য তুলে ধরা হলো:

  • মুদারাবা (Mudaraba) চুক্তির আওতায় লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগি: ইসলামিক প্রবাসী একাউন্টে আপনার জমাকৃত অর্থকে ‘রাব্বুল মাল’ (পুঁজি সরবরাহকারী) এবং ব্যাংককে ‘মুদারিব’ (ব্যবস্থাপক) হিসেবে গণ্য করে শরিয়াহ অনুমোদিত ব্যবসা ও শিল্পখাতে বিনিয়োগ করা হয়। সেখান থেকে অর্জিত হালাল মুনাফার একটি নির্ধারিত ওয়েটেজ (Weightage) অনুপাতে প্রবাসীদের মাসিক বা ষাণ্মাসিক মুনাফা প্রদান করা হয়।
  • বাই-মুয়াজ্জাল ও হিজরাহ (HPSM) পদ্ধতিতে প্রবাসী গৃহনির্মাণ বিনিয়োগ: প্রচলিত ব্যাংকের হোম লোনের পরিবর্তে ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো থেকে প্রবাসীরা হায়ার পারচেজ আন্ডার শিরকাতুল মিল্ক (HPSML) বা বাই-মুয়াজ্জাল পদ্ধতিতে শরিয়াহসম্মত উপায়ে বাড়ি নির্মাণ ও ফ্ল্যাট ক্রয়ের অর্থায়ন সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন।
  • হজ ও ওমরাহ ডিপোজিট স্কিম (NRB Hajj Savings Scheme): প্রবাসী বা তাঁদের বৃদ্ধ পিতা-মাতার পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালনের স্বপ্ন পূরণের জন্য ইসলামিক প্রবাসী একাউন্টের অধীনে ১ বছর থেকে ১০ বছর মেয়াদী বিশেষ হজ সঞ্চয় স্কিম খোলা যায়, যেখানে মাসিক সামান্য কিস্তি জমা দিয়ে মেয়াদ শেষে সম্পূর্ণ হালাল মুনাফাসহ হজের খরচ মেটানো সম্ভব।

দেশভিত্তিক প্রবাসী রেমিট্যান্স ও ব্যাংকিং গাইড:

আপনি বর্তমানে কোন দেশে কর্মরত আছেন, সেই দেশের সেরা মানি এক্সচেঞ্জ ও মোবাইল অ্যাপ থেকে বাংলাদেশে আপনার এনআরবি একাউন্টে টাকা পাঠানোর নিয়ম জানতে নিচের গাইডগুলো পড়ুন:

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রবাসী কল্যাণ ও সরকারি আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট ও দালালমুক্ত উত্তর নিচে তুলে ধরা হলো:

হ্যাঁ, অবশ্যই পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রবাসী ব্যাংকিং নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব প্রবাসীর এখনো জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) হয়নি, তাঁরা তাঁদের বৈধ বাংলাদেশি ই-পাসপোর্ট (e-Passport), বিদেশের বৈধ ভিসা/আকামা কপি এবং অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে সোনালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের এনআরবি ডেস্কে বা অনলাইন পোর্টালে প্রবাসী একাউন্ট খুলতে পারবেন।

হ্যাঁ, শতভাগ পাওয়া যাবে। আপনি যখন বিদেশের বৈধ মানি এক্সচেঞ্জ বা ব্যাংক থেকে আপনার নিজ নামের বাংলাদেশি টাকা (BDT) এনআরবি সেভিংস একাউন্টে রেমিট্যান্স পাঠাবেন, তখন মূল টাকার সাথে সরকারি ২.৫% নগদ বোনাসও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার একাউন্টে জমা হবে।

হ্যাঁ। প্রাইভেট ফরেন কারেন্সি (PFC) একাউন্টে আপনার প্রেরিত অর্থ মার্কিন ডলার (USD), পাউন্ড বা ইউরো হিসেবে জমা থাকে। ভবিষ্যতে ডলারের রেট বাড়লে আপনি যেকোনো সময় অ্যাপ বা ব্যাংকের মাধ্যমে সেই ডলার তৎকালীন উচ্চ বাজারদরে বাংলাদেশি টাকায় রূপান্তর (Encash) করতে পারবেন এবং তখন ২.৫% প্রণোদনা ও করমুক্ত সনদও পাবেন।

প্রবাসী এনআরবি একাউন্টের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ইমেইল ওটিপি (Email OTP) এবং বিদেশি মোবাইল নম্বরে এসএমএস ওটিপি সুবিধা প্রদান করে। একাউন্ট খোলার সময় বা ব্যাংকের ২৪ ঘণ্টা এনআরবি কল সেন্টারে ইমেইল করে আপনার ওটিপি অপশনটি রেজিস্টার্ড ইমেইলে সেট করে নিলে বাংলাদেশি সিম খোলা রাখার প্রয়োজন হয় না।

না। বিদেশ থেকে বৈধ চ্যানেলে পাঠানো মূল রেমিট্যান্স এবং ২.৫% সরকারি বোনাস সম্পূর্ণ (১০০%) আয়করমুক্ত। আর আপনি যদি সেই টাকা ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার বন্ড বা অফশোর ব্যাংকিং একাউন্টে জমা রাখেন, তবে সেখান থেকে প্রাপ্ত বার্ষিক মুনাফাও সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত (Tax-Free)।

আইনি ডিসক্লেইমার ও সরকারি তথ্যসূত্র

আইনি সতর্কবার্তা: "প্রবাসী একাউন্ট খোলার নিয়ম: NRB অ্যাকাউন্ট, সোনালী ও ব্র্যাক ব্যাংকের তুলনা" শীর্ষক এই নির্দেশিকাটি প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দালালচক্রের প্রতারণা প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রস্তুতকৃত একটি তথ্যমূলক গবেষণাপত্র। এটি কোনো সরকারি গেজেট বা বাণিজ্যিক আর্থিক পরামর্শ নয়। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড (WEWB), প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক (PKB) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের যেকোনো নীতিমালা, অনুদানের হার বা সুদের হার যেকোনো সময় পরিবর্তিত হতে পারে। চূড়ান্ত আবেদনের পূর্বে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন যাচাই করার অনুরোধ করা হচ্ছে।

  • প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: https://probashi.gov.bd
  • ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড (WEWB): https://wewb.gov.bd
  • প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক (Probashi Kallyan Bank): https://pkb.gov.bd
  • বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank): https://www.bb.org.bd