প্রবাসী সুযোগ সুবিধা ২০২৬: সরকার থেকে প্রবাসীরা যেসব সুবিধা পান
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলেন বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশে কর্মরত প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধা। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে প্রবাসীরা প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স দেশে পাঠান, তার ওপর ভিত্তি করেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি বাণিজ্য এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সচল থাকে। এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ত্যাগ ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (MoEWOE), ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড (WEWB), প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক (PKB), জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় ২০টিরও বেশি সরাসরি আর্থিক, সামাজিক, শিক্ষাগত ও আইনি সুযোগ-সুবিধা প্রদান করছে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সঠিক তথ্যের অভাব এবং মাঠপর্যায়ে দালাল চক্রের অপপ্রচারের কারণে অধিকাংশ প্রবাসী ও তাঁদের পরিবার জানেনই না যে সরকার থেকে তাঁরা কোন কোন সুবিধা পাওয়ার আইনগত অধিকার রাখেন। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠালে ২.৫% নগদ সরকারি রেমিট্যান্স প্রণোদনা ও শতভাগ আয়কর অব্যাহতি, বিনা জামানতে বিদেশ যাওয়ার অভিবাসন ঋণ ও দেশে ফিরে ব্যবসার পুনর্বাসন লোন, ১২% পর্যন্ত করমুক্ত মুনাফায় ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড, বিদেশে কর্মীর মৃত্যু হলে সরকারি খরচে মরদেহ দেশে আনা ও পরিবারের জন্য ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা মৃত্যু অনুদান এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রবাসী কর্মী বীমা, মেধাবী সন্তানদের জন্য বাৎসরিক প্রবাসী শিক্ষাবৃত্তি, অসুস্থ কর্মীদের ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা চিকিৎসা অনুদান, ঢাকা বিমানবন্দরে ভিআইপি প্রবাসী লাউঞ্জ এবং বিদেশ ফেরতদের রাইজ (RAISE) প্রকল্পের আওতায় নগদ ১৩,৫০০ টাকা পুনর্বাসন ভাতা—এই প্রতিটি সুবিধার শর্ত, আবেদনের নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের একদম নিখুঁত, দালালমুক্ত এবং পূর্ণাঙ্গ সরকারি নির্দেশিকা এই মাস্টার গাইডে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
🇧🇩 প্রবাসী কল্যাণ ও আর্থিক সুবিধা ক্লাস্টারের সকল বিশেষায়িত গাইড
আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী নিচের যেকোনো সরকারি সেবা ও আর্থিক সুবিধার বিস্তারিত নির্দেশিকায় সরাসরি প্রবেশ করুন:
- 🪪 ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড কার্ড ও সেবা
- ⚰️ প্রবাসীর লাশ আনা ও ৩.৩৫ লাখ অনুদান
- 🎓 প্রবাসীর সন্তানের শিক্ষাবৃত্তি ২০২৬
- 🏦 প্রবাসী NRB ব্যাংক একাউন্ট খোলার নিয়ম
- 📈 ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড (১২% লাভ)
- 💸 রেমিট্যান্সে ২.৫% সরকারি প্রণোদনা গাইড
- 💳 প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক লোন আবেদন
- ✈️ বিদেশ যাওয়ার আগে করণীয় ও বিএমইটি গাইড
১. প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও ৪টি সরকারি সংস্থার সমন্বিত সেবা কাঠামো
প্রবাসী বাংলাদেশিদের অধিকার রক্ষা, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণ এবং প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের সঠিক বিনিয়োগ ও সামাজিক সুরক্ষা প্রদানের জন্য ২০০১ সালের ২০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার পৃথকভাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (Ministry of Expatriates' Welfare and Overseas Employment - MoEWOE) প্রতিষ্ঠা করে। ২০২৬ সালে এসে এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে চারটি প্রধান সরকারি সংস্থা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) সমন্বিতভাবে প্রবাসীদের জন্য জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বহুমুখী সেবা পরিচালনা করছে। একজন সচেতন প্রবাসী হিসেবে কোন দপ্তরের কাছে কোন সেবাটি চাইতে হবে, তা স্পষ্টভাবে জানা থাকলে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল আপনাকে হয়রানি করতে পারবে না।
অনেক সময় সাধারণ প্রবাসীরা বিএমইটি (BMET), ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড (WEWB) এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক (PKB)-এর কাজকে এক করে ফেলেন। যেমন—কেউ হয়তো মৃত প্রবাসীর ৩ লাখ টাকা অনুদানের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে গিয়ে ভিড় করেন, আবার কেউ বিদেশ যাওয়ার লোনের জন্য কল্যাণ বোর্ডের ডেস্কে আবেদন করেন। অথচ প্রতিটি সংস্থার আইনগত এখতিয়ার এবং সেবা প্রদানের তহবিল সম্পূর্ণ আলাদা। নিচে প্রবাসীদের সেবায় নিয়োজিত প্রধান ৫টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও সেবার তালিকা তুলনামূলক টেবিলে উপস্থাপন করা হলো:
| সরকারি সংস্থার নাম | প্রধান ভূমিকা ও আইনগত ভিত্তি | প্রবাসীরা যেসব সরাসরি সুবিধা পান | অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ও হেল্পলাইন |
|---|---|---|---|
| ১. ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড (WEWB) | ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড আইন, ২০১৮ দ্বারা গঠিত সংবিধিবদ্ধ কল্যাণ তহবিল সংস্থা | মৃত প্রবাসীর পরিবারকে ৩.৩৫ লাখ টাকা অনুদান, ফ্রি মরদেহ পরিবহন, সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি, ১.৫ লাখ টাকা চিকিৎসা সহায়তা, সেফ হোম ও রাইজ (RAISE) পুনর্বাসন ভাতা | wewb.gov.bdহেল্পলাইন: ১৬১৩৫ (টোল-ফ্রি) |
| ২. জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) | বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩ অনুযায়ী বহির্গমন ছাড়পত্র ও প্রশিক্ষণ সংস্থা | বিএমইটি ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন, স্মার্ট কার্ড (ই-ক্লিয়ারেন্স), টিটিসি (TTC) কারিগরি প্রশিক্ষণ, ৩ দিনের পিডিও (PDO) সনদ ও প্রবাসী কর্মী বীমা সংযুক্তিকরণ | bmet.gov.bd / amiprobashi.com |
| ৩. প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক (PKB) | প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক আইন, ২০১০ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত বিশেষায়িত রাষ্ট্রায়ত্ত তফসিলি ব্যাংক | বিনা জামানতে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত অভিবাসন লোন, দেশে ফেরতদের ৫–৫০ লাখ টাকা পুনর্বাসন ঋণ, প্রবাসী হোম লোন এবং রেমিট্যান্স ক্যাশ পেমেন্ট | pkb.gov.bdসারা দেশে ১২০+ শাখা |
| ৪. বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (BOESL) | সরকারের একমাত্র নিজস্ব জনশক্তি প্রেরণকারী রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি | দালালমুক্ত ও ন্যূনতম সরকারি খরচে দক্ষিণ কোরিয়া (EPS), জাপান, জর্ডান ও পূর্ব ইউরোপে সরকারিভাবে কর্মী প্রেরণ | boesl.gov.bd |
| ৫. বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর | কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ | বৈধ রেমিট্যান্সে ২.৫% নগদ সরকারি প্রণোদনা, ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড (১২% মুনাফা), ইউএস ডলার বন্ড এবং এনআরবি ব্যাংকিং নীতিমালা | bb.org.bd / nationalsavings.gov.bd |
রাজধানী ঢাকার ৭১-৭২ ইস্কাটন গার্ডেন রোডে অবস্থিত ‘প্রবাসী কল্যাণ ভবন’ হলো এই সমস্ত সেবার কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর। তবে ২০২৬ সালে প্রবাসীদের আর ছোটখাটো কাজের জন্য ঢাকায় দৌড়াতে হয় না। দেশের ৪২টি জেলায় অবস্থিত জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস (DEMO), ১০০টিরও বেশি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (TTC), প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ১২০টিরও বেশি শাখা এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর শ্রম কল্যাণ উইং (Labour Welfare Wing) থেকে সরাসরি এই সেবাগুলো প্রদান করা হচ্ছে।
২. ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড মেম্বারশিপ ও প্রবাসী কল্যাণ কার্ডের সুবিধা
সরকার থেকে প্রবাসীদের জন্য বরাদ্দকৃত প্রায় সকল সামাজিক ও মানবিক অনুদান (যেমন—মৃত্যু অনুদান, সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি, চিকিৎসা সহায়তা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও আইনি সহায়তা) পাওয়ার সবচেয়ে প্রধান চাবিকাঠি হলো ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড (Wage Earners' Welfare Board - WEWB)-এর বৈধ সদস্যপদ বা প্রবাসী কল্যাণ মেম্বারশিপ কার্ড। অনেকেই প্রশ্ন করেন—এই সদস্যপদ কীভাবে পাওয়া যায় এবং যাঁরা ভিজিট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা বা ফ্যামিলি ভিসায় বিদেশে গিয়ে পরবর্তীতে কাজের আকামা বা ওয়ার্ক পারমিট লাগিয়েছেন, তাঁরা কি এই সরকারি সুবিধা পাবেন?
কীভাবে প্রবাসী কল্যাণ বোর্ডের সদস্যপদ অর্জিত হয়? (দুটি প্রধান মাধ্যম)
- দেশ থেকে বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স নিয়ে যাওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রে (স্বয়ংক্রিয় সদস্যপদ): যেসব কর্মী বাংলাদেশ থেকে বৈধ ওয়ার্ক ভিসায় যাওয়ার সময় জনশক্তি ব্যুরো (BMET) বা আমি প্রবাসী (Ami Probashi) অ্যাপের মাধ্যমে সরকারি ফি (কল্যাণ ফি বাবদ নির্ধারিত চার্জ ও বীমা প্রিমিয়াম) জমা দিয়ে বিএমইটি স্মার্ট কার্ড (BMET Smart Card) বা ই-ক্লিয়ারেন্স গ্রহণ করেন, তাঁরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের নিবন্ধিত সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান। তাঁদের আলাদা করে নতুন কোনো কার্ড করার প্রয়োজন হয় না; বিএমইটি স্মার্ট কার্ডটিই কল্যাণ বোর্ডের সদস্যপদের চূড়ান্ত প্রমাণ।
- বিদেশে অবস্থানরত অনিবন্ধিত প্রবাসীদের ক্ষেত্রে (দূতাবাস ও অনলাইন মেম্বারশিপ): যেসব প্রবাসী পূর্বে ট্যুরিস্ট ভিসা, ওমরাহ ভিসা, আজাদ ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা কিংবা বিএমইটি ছাড়পত্র ছাড়া বিদেশে গেছেন কিন্তু বর্তমানে সেখানে বৈধ রেসিডেন্স পারমিট (Iqama / QID / Civil ID / Work Permit) নিয়ে কাজ বা ব্যবসা করছেন, তাঁরা
member.wewb.gov.bdপোর্টালে অনলাইনে আবেদন করে এবং সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে নির্ধারিত এককালীন কল্যাণ ফি জমা দিয়ে WEWB মেম্বারশিপ কার্ড সংগ্রহ করতে পারেন।
প্রবাসী কল্যাণ বোর্ডের সদস্য কার্ড থাকলে কী কী সরাসরি সুবিধা পাওয়া যায়?
- মৃত্যুতে ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা নিশ্চিত অনুদান: প্রবাসে বা ছুটিতে দেশে এসে সদস্যের মৃত্যু হলে পরিবারকে বিমানবন্দরে ৩৫,০০০ টাকা এবং চেক/ইএফটি মারফত আরও ৩,০০,০০০ টাকা এককালীন অনুদান প্রদান।
- মেধাবী সন্তানদের বাৎসরিক শিক্ষাবৃত্তি: প্রবাসীর সন্তানদের এসএসসি ও এইচএসসি উত্তীর্ণ হওয়ার পর কলেজ, ডিপ্লোমা, মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য প্রতি বছর নগদ শিক্ষাবৃত্তি।
- বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (প্রতিবন্ধী) সন্তানদের ভাতা: প্রবাসীর কোনো সন্তান অটিজম বা শারীরিক/মানসিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হলে মাসিক ১,০০০ টাকা হারে বছরে ১২,০০০ টাকা করে টানা ৫ বছর ভাতা প্রদান।
- দুর্ঘটনা ও জটিল রোগে ১.৫ লাখ টাকা চিকিৎসা সহায়তা: বিদেশে কর্মক্ষেত্রে আহত বা গুরুতর অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরলে সর্বোচ্চ ১,৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত সরকারি চিকিৎসা অনুদান।
- বিমানবন্দর থেকে ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস: অসুস্থ প্রবাসী বা মৃত প্রবাসীর মরদেহ ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেট বিমানবন্দর থেকে দেশের যেকোনো প্রত্যন্ত গ্রামের বাড়িতে বিনা খরচে পৌঁছে দেওয়া।
- দূতাবাসের মাধ্যমে ফ্রি আইনি সহায়তা ও সেফ হোম: বিদেশে কফিল বা কোম্পানির সাথে বিরোধ, বকেয়া বেতন উদ্ধার কিংবা জেলখানায় আটক হলে সরকারি খরচে আইনজীবী নিয়োগ।
৩. বৈধ রেমিট্যান্সে ২.৫% সরকারি নগদ প্রণোদনা ও শতভাগ করমুক্ত আয় সুবিধা
প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ অবৈধ হুন্ডি চক্রের হাত থেকে রক্ষা করে বৈধ ব্যাংকিং ও মোবাইল ওয়ালেট চ্যানেলে দেশে আনার জন্য বাংলাদেশ সরকার যে সবচেয়ে বড় আর্থিক পুরস্কারটি চালু রেখেছে, তা হলো বৈধ রেমিট্যান্সের ওপর ২.৫% (আড়াই শতাংশ) নগদ সরকারি প্রণোদনা বা ক্যাশ ইনসেনটিভ। ২০২৬ সালেও অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের এফই (FE) সার্কুলার অনুযায়ী বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে বৈধ এক্সচেঞ্জ হাউজ, ব্যাংক একাউন্ট অথবা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে টাকা পাঠালে মূল টাকার সাথে অতিরিক্ত ২.৫% নগদ বোনাস সরাসরি সুবিধাভোগীর হিসাবে জমা হয়।
উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়া থেকে কোনো প্রবাসী যদি ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে ১,০০,০০০ (এক লাখ) টাকা পাঠান, তবে তাঁর পরিবারের সদস্য ব্যাংক বা বিকাশ থেকে মূল ১ লাখ টাকার সাথে সরকারি বোনাস আরও ২,৫০০ টাকাসহ মোট ১,০২,৫০০ টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন আর ৫ লাখ বা ১০ লাখ টাকার রেমিট্যান্সের ওপরও ২.৫% প্রণোদনা পেতে বিদেশের চাকরির চুক্তিপত্র বা স্যালারি স্লিপ ব্যাংকে জমা দিতে হয় না! বৈধ এক্সচেঞ্জ হাউজ থেকে প্রেরিত যেকোনো অংকের ওয়েজ আর্নার্স রেমিট্যান্সেই বিনা কাগজপত্রে এই বোনাস প্রদান করা হয়।
| প্রেরিত মূল রেমিট্যান্স (BDT) | সরকারি ২.৫% প্রণোদনা (নগদ বোনাস) | ব্যাংকের নিজস্ব বোনাস / এক্সচেঞ্জ অফার (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) | পরিবারের প্রাপ্ত মোট টাকা (BDT) | আয়কর (Income Tax) স্ট্যাটাস |
|---|---|---|---|---|
| ২০,০০০ টাকা | ৫০০ টাকা | ব্যাংকভেদে অতিরিক্ত ৫০–১০০ টাকা | ২০,৫০০ টাকা+ | ১০০% আয়করমুক্ত (Tax Exempted) |
| ৫০,০০০ টাকা | ১,২৫০ টাকা | ব্যাংকভেদে অতিরিক্ত ১০০–২৫০ টাকা | ৫১,২৫০ টাকা+ | ১০০% আয়করমুক্ত (Tax Exempted) |
| ১,০০,০০০ টাকা (১ লাখ) | ২,৫০০ টাকা | ব্যাংকভেদে অতিরিক্ত ২০০–৫০০ টাকা | ১,০২,৫০০ টাকা+ | ১০০% আয়করমুক্ত (Tax Exempted) |
| ৫,০০,০০০ টাকা (৫ লাখ) | ১২,৫০০ টাকা | ক্রস-বর্ডার স্পেশাল রেট বেনিফিট | ৫,১২,৫০০ টাকা+ | ১০০% আয়করমুক্ত (Tax Exempted) |
| ১০,০০,০০০ টাকা (১০ লাখ) | ২৫,০০০ টাকা | প্রবাসী প্রায়োরিটি রেট বেনিফিট | ১০,২৫,০০০ টাকা+ | ১০০% আয়করমুক্ত (Tax Exempted) |
বৈধ রেমিট্যান্সে শতভাগ আয়কর অব্যাহতি (Income Tax Exemption):
বাংলাদেশের আয়কর আইন, ২০২৩ (Income Tax Act, 2023)-এর ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী, কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি যদি বিদেশে উপার্জিত অর্থ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে বাংলাদেশে পাঠান, তবে সেই পুরো অর্থের ওপর এবং প্রাপ্ত ২.৫% সরকারি প্রণোদনার ওপর এক টাকাও আয়কর (Income Tax) দিতে হয় না। ভবিষ্যতে আপনি যখন বাংলাদেশে জমি কিনবেন, বাড়ি তৈরি করবেন, ফ্ল্যাট কিনবেন বা ব্যবসা শুরু করবেন, তখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) আপনার টাকার উৎস জানতে চাইলে ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত রেমিট্যান্স সার্টিফিকেট (Encashment Certificate) দেখালেই তা বৈধ সাদা টাকা হিসেবে স্বীকৃত হবে। বিপরীতে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠালে তা আইনের চোখে ‘কালো টাকা’ হিসেবে গণ্য হয় এবং ভবিষ্যতে সম্পত্তি ক্রয়ের সময় জরিমানার মুখে পড়তে হয়।
প্রতিদিন টাকা পাঠানোর আগে কোন ব্যাংকে বা এক্সচেঞ্জ হাউজে আজকের টাকার রেট সবচেয়ে বেশি চলছে এবং ২.৫% প্রণোদনাসহ প্রকৃতপক্ষে কত টাকা পাবেন, তা আপনার স্মার্টফোনে সরাসরি মিলিয়ে নিতে Taka Rate Today অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন। আর যদি কখনো বোনাসের টাকা একাউন্টে জমা হতে দেরি হয় বা না আসে, তবে করণীয় জানতে আমাদের রেমিট্যান্স প্রণোদনা ২০২৬: ২.৫% প্রণোদনা কি, কত পাবেন ও না পেলে করণীয় আর্টিকেলটি দেখুন।
৪. প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক লোন: অভিবাসন ঋণ, পুনর্বাসন ঋণ ও বঙ্গবন্ধু অভিবাসী লোন
বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর বা ইউরোপে যাওয়ার সময় সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দেয় ভিসা ও বিমানের টিকিটের টাকা জোগাড় করা নিয়ে। গ্রামের সাধারণ তরুণরা উচ্চ সুদে মহাজনি ঋণ নিয়ে বা বাপ-দাদার শেষ সম্বল কৃষি জমি বিক্রি করে বিদেশে যান এবং প্রবাস জীবনের প্রথম ২–৩ বছর শুধু সেই সুদের টাকা শোধ করতেই নিঃস্ব হয়ে পড়েন। এই অভিশাপ থেকে কর্মীদের মুক্তি দিতে বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা করেছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক (Probashi Kallyan Bank - PKB)। ২০২৬ সালে এই ব্যাংক থেকে মাত্র ৭% থেকে ৯% সরল সুদে চার ধরনের বিশেষায়িত প্রবাসী লোন প্রদান করা হচ্ছে।
| লোনের ক্যাটাগরি ও নাম | সর্বোচ্চ ঋণের পরিমাণ | বার্ষিক সুদের হার | জামানত (Collateral) ও শর্ত | পরিশোধের মেয়াদ ও গ্রেস পিরিয়ড |
|---|---|---|---|---|
| ১. অভিবাসন ঋণ (Migration Loan) (বিদেশ যাওয়ার খরচ মেটাতে) |
সর্বোচ্চ ৩,০০,০০০ টাকা (দেশ ও ভিসাভেদে) | ৯% (সরল সুদ) | বিনা জামানতে (জমির দলিল লাগে না); শুধুমাত্র পরিবারের ১–২ জন সচ্ছল জামিনদার (Guarantor) ও আসল ভিসা কপি | দেড় থেকে ৩ বছর (২ মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ মাসিক কিস্তিতে) |
| ২. পুনর্বাসন ঋণ (Rehabilitation Loan) (দেশে ফিরে ব্যবসা বা খামার করতে) |
৫০,০০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০,০০,০০০ (৫০ লাখ) টাকা | ৯% (নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৭%–৮%) | ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যক্তিগত গ্যারান্টিতে বিনা জামানতে; ৩ লাখের ওপরে প্রকল্পের জামানত সাপেক্ষে | সর্বোচ্চ ৫ থেকে ৭ বছর (প্রকল্পভেদে ৩–৬ মাস গ্রেস পিরিয়ড) |
| ৩. বিশেষ পুনর্বাসন লোন (WEWB তহবিল) (ক্ষতিগ্রস্ত ও শূন্য হাতে ফেরতদের জন্য) |
১,০০,০০০ টাকা থেকে ৫,০০,০০০ টাকা | ৪% (নামমাত্র সার্ভিস চার্জ) | কল্যাণ বোর্ডের তালিকাভুক্ত প্রত্যাগত কর্মীদের ক্ষেত্রে সহজ শর্তে জামিনদার ভিত্তিক | ২ থেকে ৩ বছর (সহজ মাসিক কিস্তি) |
| ৪. প্রবাসী গৃহনির্মাণ ঋণ (Home Loan) (দেশে বাড়ি তৈরি বা ফ্ল্যাট ক্রয়) |
১০,০০,০০০ টাকা থেকে ১,০০,০০,০০০ (১ কোটি) টাকা | ৯%–১০% (বাংলাদেশ ব্যাংক রেট অনুযায়ী) | প্রস্তাবিত জমি বা ফ্ল্যাটের দলিল বন্ধক এবং নিয়মিত বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রমাণ | ৫ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী কিস্তি |
ভিসা হাতে পাওয়ার পর মাত্র ৩ থেকে ৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের যেকোনো শাখা থেকে কিংবা আমি প্রবাসী (Ami Probashi) অ্যাপের মাধ্যমে প্রি-লোন আবেদন করে কীভাবে এই ঋণ তুলবেন, কী কী কাগজপত্র লাগবে এবং মাসিক কিস্তি কত পড়বে, তার এ-টু-জেড গাইডলাইন আমাদের প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক লোন ২০২৬: অভিবাসন ঋণের শর্ত, কাগজ ও আবেদন আর্টিকেলে বিস্তারিত দেওয়া হয়েছে।
৫. ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড ও ইউএস ডলার বন্ডে ১২% করমুক্ত মুনাফা
অধিকাংশ প্রবাসী সারা জীবন বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে যে টাকা দেশে পাঠান, তা হয় পরিবারের নিত্যদিনের খরচে শেষ হয়ে যায়, নতুবা সঠিক বিনিয়োগের অভাবে অলস পড়ে থাকে কিংবা জালিয়াতি বা ভুয়া এমএলএম কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে খোয়া যায়। অথচ শুধুমাত্র প্রবাসীদের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক তিনটি শতভাগ রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিযুক্ত ও করমুক্ত সরকারি বন্ড পরিচালনা করে আসছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ৫ বছর মেয়াদী ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড (Wage Earner Development Bond - WEDB)।
প্রবাসীদের জন্য ৩টি সরকারি বন্ডের তুলনামূলক বৈশিষ্ট্য ও মুনাফার হার (২০২৬):
| সরকারি বন্ডের নাম | মুদ্রা ও মেয়াদকাল | মেয়াদান্তে বার্ষিক মুনাফার হার (Slabs) | সর্বোচ্চ বিনিয়োগ সীমা | বিশেষ সুবিধা (কর ও মৃত্যু বীমা) |
|---|---|---|---|---|
| ১. ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড (WEDB) | বাংলাদেশি টাকা (BDT) মেয়াদ: ৫ বছর |
• ১ লাখ – ১৫ লাখ: ১২.০০% • ১৫ লাখের ওপরে – ৩০ লাখ: ১১.০০% • ৩০ লাখের ওপরে – ৫০ লাখ: ১০.০০% • ৫০ লাখের ওপরে – ১ কোটি: ৯.০০% |
সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা (সকল বন্ড মিলিয়ে) | • মুনাফা সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত • ৪০% থেকে ৫০% অতিরিক্ত মৃত্যু ঝুঁকি বীমা (সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত) • প্রতি ৬ মাস অন্তর মুনাফা উত্তোলনের সুযোগ |
| ২. ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড (US Dollar Premium Bond) | মার্কিন ডলার (USD) মূল্যে ক্রয়, মুনাফা টাকায় (BDT) মেয়াদ: ৩ বছর |
• ১ম বছর শেষে: ৬.৫০% • ২য় বছর শেষে: ৭.০০% • ৩য় বছর (মেয়াদান্তে): ৭.৫০% (স্ল্যাবভেদে পরিবর্তনশীল) |
১ কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা (সমন্বিত সীমা) | • মুনাফা আয়করমুক্ত • ১৫% থেকে ২৫% মৃত্যু ঝুঁকি সুবিধা • ডলারের বিনিময় হার বাড়লে আসল টাকার মূল্যও বৃদ্ধি পায় |
| ৩. ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড (US Dollar Investment Bond) | আসল ও মুনাফা উভয়ই মার্কিন ডলারে (USD) মেয়াদ: ৩ বছর |
• ১ম বছর শেষে: ৫.৫০% • ২য় বছর শেষে: ৬.০০% • ৩য় বছর (মেয়াদান্তে): ৬.৫০% (ডলারে প্রদেয়) |
১ কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা (সমন্বিত সীমা) | • আসল ও মুনাফা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় (USD) ফেরত নেওয়ার বা বিদেশে রিপ্যাট্রিয়েট করার সুবিধা • শতভাগ করমুক্ত আয় |
ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ডের সবচেয়ে অনন্য দিক হলো এর মৃত্যু ঝুঁকি সুবিধা (Death Risk Benefit)। কোনো প্রবাসী যদি ১০ লাখ টাকার বন্ড কেনার পর মেয়াদ চলাকালীন (৫৫ বছর বয়সের মধ্যে) মৃত্যুবরণ করেন, তবে তাঁর নমিনি মূল ১০ লাখ টাকা এবং অর্জিত ১২% মুনাফা তো পাবেনই—তার ওপর অতিরিক্ত ৪০% থেকে ৫০% (অর্থাৎ আরও ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা) সরকারি বীমা সুবিধা হিসেবে এককালীন লাভ করবেন! কীভাবে বিদেশের এক্সচেঞ্জ হাউজ বা দেশের এডি (AD) ব্যাংক শাখা থেকে এই বন্ড কিনবেন এবং ক্যালকুলেটরে লাভের হিসাব করবেন, তা জানতে পড়ুন: ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড ২০২৬: মুনাফার হার, কেনার নিয়ম ও ক্যালকুলেটর।
৬. প্রবাসী ব্যাংক একাউন্ট (NRB Account), NFCD ও অফশোর ব্যাংকিং সুবিধা
আগে প্রবাসীদের বাংলাদেশে একটি ব্যাংক একাউন্ট খুলতে হলে ছুটিতে দেশে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। কিন্তু ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ই-কেওয়াইসি (e-KYC) নীতিমালা এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সংস্কারের ফলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসে নিজের স্মার্টফোন দিয়ে মাত্র ১০ মিনিটে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে প্রবাসী ব্যাংক একাউন্ট (NRB Probashi Account) খোলা সম্ভব।
প্রবাসীদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত ৪ ধরনের বিশেষ ব্যাংক হিসাব:
- এনআরবি টাকা সেভিংস ও ডিপোজিট একাউন্ট (NRB BDT Account): এটি বাংলাদেশি টাকায় পরিচালিত বিশেষ সঞ্চয়ী হিসাব। বিদেশ থেকে পাঠানো বৈধ রেমিট্যান্স সরাসরি এই একাউন্টে ২.৫% সরকারি বোনাসসহ জমা হয়। এখান থেকে আপনি সোনালী ব্যাংকের Sonali e-Wallet, ইসলামী ব্যাংকের CellFin, ব্র্যাক ব্যাংকের Astha কিংবা সিটি ব্যাংকের Citytouch অ্যাপের মাধ্যমে বিদেশে বসেই প্রবাসী ডিপিএস (DPS), এফডিআর (FDR) ও পরিবারের একাউন্টে টাকা ট্রান্সফার করতে পারবেন।
- প্রবাসী ফরেন কারেন্সি একাউন্ট (Private Foreign Currency - PFC Account): আপনি যদি চান আপনার পাঠানো ডলার, রিয়াল, দিরহাম, দিনার বা পাউন্ড বাংলাদেশি টাকায় রূপান্তর না করে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় জমা রাখবেন, তবে যেকোনো এডি (Authorized Dealer) ব্যাংকে ফরেন কারেন্সি একাউন্ট খুলতে পারেন। এই হিসাবের বিপরীতে আন্তর্জাতিক মানের সুদ বা মুনাফা পাওয়া যায় এবং ইন্টারন্যাশনাল ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করা যায়।
- নন-রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট (NFCD Account): এটি বৈদেশিক মুদ্রায় মেয়াদী আমানত (Fixed Deposit) হিসাব। ১ মাস, ৩ মাস, ৬ মাস বা ১ বছর মেয়াদে ডলার বা ইউরো জমা রেখে উচ্চ হারে করমুক্ত বৈদেশিক মুদ্রার মুনাফা অর্জন করা যায়।
- অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট একাউন্ট (Offshore Banking Deposit - OBU): অফশোর ব্যাংকিং আইন, ২০২৪ ও ২০২৬ সালের হালনাগাদ নির্দেশনা অনুযায়ী প্রবাসী বাংলাদেশিরা এবং তাঁদের বিদেশি পরিচিতজনরা বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে আন্তর্জাতিক মুদ্রায় (USD/EUR/GBP) একাউন্ট খুলতে পারেন। এর প্রধান সুবিধা হলো—এখানে প্রাপ্ত মুনাফা সম্পূর্ণ করমুক্ত এবং যেকোনো সময় আসল ও মুনাফাসহ পুরো বৈদেশিক মুদ্রা বিনা বাধায় পুনরায় বিদেশে স্থানান্তর (Repatriate) করা যায়।
সোনালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের মধ্যে কোন ব্যাংকে প্রবাসী একাউন্ট খোলা সবচেয়ে লাভজনক এবং কী কী ডকুমেন্ট লাগে, তা তুলনা করতে আমাদের প্রবাসী একাউন্ট খোলার নিয়ম: NRB অ্যাকাউন্ট, সোনালী ও ব্র্যাক ব্যাংকের তুলনা গাইডটি পড়ুন।
৭. সর্বজনীন পেনশন ‘প্রবাস’ (Probash) স্কিম: প্রবাসীদের আজীবন সরকারি পেনশন
প্রবাসীদের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—যৌবনের ২০ থেকে ২৫ বছর সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত বা মালয়েশিয়ায় হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে পরিবারের সবার ভাগ্য পরিবর্তন করলেও, ৫০ বা ৬০ বছর বয়সে যখন শরীর ভেঙে পড়ে এবং চূড়ান্ত এক্সিট (Final Exit) নিয়ে দেশে ফিরে আসেন, তখন নিজের হাতখরচ বা ওষুধ কেনার মতোও মাসিক কোনো নির্দিষ্ট আয়ের পথ থাকে না। সরকারি চাকরিজীবীদের মতো প্রবাসীদেরও যেন বৃদ্ধ বয়সে কারও কাছে হাত পাততে না হয়, সেজন্য জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ প্রবাসীদের জন্য চালু করেছে বিশেষ সরকারি পেনশন ব্যবস্থা—সর্বজনীন পেনশন ‘প্রবাস’ (Probash) স্কিম।
‘প্রবাস’ পেনশন স্কিমের মূল নিয়ম ও আর্থিক সুবিধা (২০২৬):
- অংশগ্রহণের যোগ্যতা: ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী যেকোনো প্রবাসী বাংলাদেশি (এনআইডি অথবা পাসপোর্ট দিয়ে নিবন্ধনযোগ্য)। এমনকি ৫০ বছরের বেশি বয়সী প্রবাসীরাও টানা ১০ বছর কিস্তি প্রদান শর্তে এই স্কিমে যুক্ত হতে পারেন।
- মাসিক চাঁদার পরিমাণ (৪টি ধাপ): প্রবাসীরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী মাসে ২,০০০ টাকা, ৫,০০০ টাকা, ৭,৫০০ টাকা অথবা ১০,০০০ টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা আন্তর্জাতিক কার্ড, এক্সচেঞ্জ হাউজ বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জমা দিতে পারেন। দেশে ফিরে এলে স্কিমটি সহজেই ‘প্রগতি’ বা ‘সুরক্ষা’ স্কিমে রূপান্তর করা যায়।
- আজীবন মাসিক পেনশন ও নমিনি সুরক্ষা: চাঁদাদাতার বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হলেই প্রতি মাসে সরাসরি তাঁর ব্যাংক একাউন্টে আজীবন পেনশন জমা হতে থাকবে। পেনশনার যদি ৭৫ বছর বয়সের আগে মারা যান, তবে তাঁর নমিনি ৭৫ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অবশিষ্ট সময়কাল একই হারে মাসিক পেনশন পেতে থাকবেন।
- জমাকৃত অর্থ থেকে ৫০% ঋণ সুবিধা ও কর ছাড়: ভবিষ্যতে জরুরি প্রয়োজনে (যেমন—চিকিৎসা বা সন্তানের বিয়ে) নিজের জমাকৃত মোট অর্থের সর্বোচ্চ ৫০% পর্যন্ত ঋণ হিসেবে উত্তোলন করা যায় এবং পেনশন বাবদ প্রাপ্ত পুরো অর্থই সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত।
| মাসিক চাঁদার হার (প্রবাস স্কিম) | ১০ বছর চাঁদা দিলে মাসিক পেনশন | ২০ বছর চাঁদা দিলে মাসিক পেনশন | ৩০ বছর চাঁদা দিলে মাসিক পেনশন | ৪২ বছর (১৮ থেকে ৬০ বছর) চাঁদা দিলে মাসিক পেনশন |
|---|---|---|---|---|
| ২,০০০ টাকা / মাস | ৩,০৬০ টাকা / মাস | ৯,৩২২ টাকা / মাস | ২৪,৬৩৪ টাকা / মাস | ৬৮,৯৩১ টাকা / মাস |
| ৫,০০০ টাকা / মাস | ৭,৬৫১ টাকা / মাস | ২৩,৩০৫ টাকা / মাস | ৬১,৫৮৬ টাকা / মাস | ১,৭২,৩২৭ টাকা / মাস |
| ৭,৫০০ টাকা / মাস | ১১,৪৭৭ টাকা / মাস | ৩৪,৯৫৭ টাকা / মাস | ৯২,৩৭৯ টাকা / মাস | ২,৫৮,৪৯১ টাকা / মাস |
| ১০,০০০ টাকা / মাস | ১৫,৩০২ টাকা / মাস | ৪৬,৬০৯ টাকা / মাস | ১,২৩,১৭২ টাকা / মাস | ৩,৪৪,৬৫৫ টাকা / মাস |
অনলাইনে upension.gov.bd পোর্টালে গিয়ে মাত্র ৫ মিনিটে পাসপোর্ট বা এনআইডি নম্বর দিয়ে প্রবাস স্কিমে নিবন্ধন করা যায়।
৮. বাধ্যতামূলক প্রবাসী কর্মী বীমা: দুর্ঘটনা ও মৃত্যুতে ১০ লাখ টাকা কাভারেজ
২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশ সরকার প্রবাসী কর্মীদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার করতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জীবন বীমা কর্পোরেশন (Jiban Bima Corporation) এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক প্রবাসী কর্মী বীমা (Mandatory Migrant Workers Insurance Policy) চালু করেছে। পরবর্তীতে এই বীমার কাভারেজ ও মেয়াদ বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। ২০২৬ সালের হালনাগাদ নীতিমালা অনুযায়ী, বৈধ বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স নিয়ে বিদেশগামী প্রতিটি কর্মী সর্বোচ্চ ১০,০০,০০০ (দশ লাখ) টাকা পর্যন্ত বীমা সুরক্ষার আওতাভুক্ত থাকেন!
প্রবাসী কর্মী বীমার প্রিমিয়াম, মেয়াদ ও দাবি আদায়ের শর্তাবলী:
- এককালীন নামমাত্র প্রিমিয়াম ও ৫ বছর মেয়াদ: বিদেশ যাওয়ার সময় বিএমইটি স্মার্ট কার্ড (ই-ক্লিয়ারেন্স) করার ধাপে মাত্র এককালীন নির্ধারিত প্রিমিয়াম (প্রায় ১,০০০ টাকা, যার একটি অংশ কল্যাণ বোর্ড ভর্তুকি দেয়) জমা দিলেই পরবর্তী ৫ বছরের (৬০ মাস) জন্য কর্মী ১০ লাখ টাকার জীবন ও দুর্ঘটনা বীমার আওতায় চলে আসেন।
- মৃত্যুতে শতভাগ (১০ লাখ টাকা) ক্ষতিপূরণ: বীমা পলিসি বলবৎ থাকা অবস্থায় প্রবাসে অথবা ছুটিতে দেশে এসে যেকোনো কারণে (দুর্ঘটনা বা স্বাভাবিক মৃত্যু—উভয় ক্ষেত্রেই) কর্মীর মৃত্যু হলে তাঁর বৈধ নমিনি বা ওয়ারিশগণ জীবন বীমা কর্পোরেশন থেকে এককালীন ১০,০০,০০০ (দশ লাখ) টাকা পাবেন। এটি কল্যাণ বোর্ডের নিয়মিত ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা মৃত্যু অনুদানের অতিরিক্ত! অর্থাৎ বীমাকৃত কর্মীর পরিবার মোট ১৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা সরকারিভাবে লাভ করেন।
- স্থায়ী সম্পূর্ণ পঙ্গুত্বে ১০০% এবং আংশিক পঙ্গুত্বে আনুপাতিক ক্ষতিপূরণ: কর্মক্ষেত্রে বা সড়ক দুর্ঘটনায় কর্মীর দুটি চোখ, দুটি হাত বা দুটি পা চিরতরে কর্মক্ষমতা হারালে (স্থায়ী সম্পূর্ণ অক্ষমতা) কর্মী নিজেই জীবিত অবস্থায় ১০ লাখ টাকা বীমা দাবি পাবেন। আর একটি অঙ্গ হারালে বা আংশিক পঙ্গুত্বের শিকার হলে মেডিকেল বোর্ডের সনদ অনুযায়ী ১০% থেকে ৫০% (১ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা) পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়।
৯. প্রবাসীর মৃত্যু হলে করণীয়: ফ্রি মরদেহ পরিবহন ও ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা অনুদান
প্রবাস জীবনে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা হলো কোনো রেমিট্যান্স যোদ্ধার আকস্মিক মৃত্যু। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে যখন স্ত্রী-সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মা দিশেহারা হয়ে পড়েন, তখন প্রবাস থেকে মরদেহ দেশে আনা এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ ভরণপোষণের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় বাংলাদেশ সরকারের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড (WEWB)। এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ধাপগুলো আমাদের প্রবাসীর মৃত্যু হলে করণীয়: লাশ দেশে আনা ও সরকারি অনুদান পাওয়ার নিয়ম আর্টিকেলে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
মৃত প্রবাসীর পরিবারের জন্য ৪টি তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদী সরকারি সুবিধা:
- সরকারি খরচে মরদেহ দেশে পরিবহন (Free Body Repatriation): বিদেশে কোনো বৈধ প্রবাসী (কিংবা চরম বিপদগ্রস্ত অনিবন্ধিত কর্মী, যাঁর কফিল বা কোম্পানি খরচ দিচ্ছে না) মৃত্যুবরণ করলে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কল্যাণ উইংয়ের মাধ্যমে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিশেষ ব্যবস্থাপনায় মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
- বিমানবন্দরে তাৎক্ষণিক ৩৫,০০০ টাকা দাফন ও পরিবহন অনুদান: ঢাকা (হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর), চট্টগ্রাম (শাহ আমানত বিমানবন্দর) বা সিলেট (ওসমানী বিমানবন্দর)-এ মরদেহ পৌঁছানোর সাথে সাথে বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে মৃতের নিকটাত্মীয়ের হাতে তাৎক্ষণিক দাফন-কাফন খরচের জন্য নগদ বা চেক মারফত ৩৫,০০০ (পঁয়ত্রিশ হাজার) টাকা এবং মরদেহ বাড়িতে নেওয়ার জন্য ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা প্রদান করা হয়।
- পরিবারের জন্য ৩,০০,০০০ (তিন লাখ) টাকা এককালীন আর্থিক অনুদান: দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর মৃত প্রবাসীর বৈধ ওয়ারিশগণ (স্ত্রী, সন্তান ও পিতা-মাতা) ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা পৌর মেয়রের কাছ থেকে নির্ধারিত ফরমে ওয়ারিশ সনদ (Legal Heir Certificate) সংগ্রহ করে জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস (DEMO)-এর মাধ্যমে আবেদন করলে কল্যাণ বোর্ড থেকে সরাসরি ওয়ারিশদের ব্যাংক হিসাবে ৩,০০,০০০ (তিন লাখ) টাকা এককালীন মৃত্যু অনুদান প্রদান করা হয়।
- বকেয়া বেতন, সার্ভিস বেনিফিট ও রক্তমূল্য (Diyat) আদায়: মৃত প্রবাসী যদি বিদেশের কোম্পানিতে বেতন বা গ্র্যাচুইটি পাওনা থাকেন কিংবা সড়ক বা কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন, তবে দূতাবাসের শ্রম উইং ফ্রি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদেশের আদালত ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি থেকে লাখ লাখ টাকার মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ বা দিয়াত (Diya / Blood Money) আদায় করে কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।
১০. প্রবাসীর মেধাবী সন্তানদের সরকারি শিক্ষাবৃত্তি, কোটা ও প্রতিবন্ধী ভাতা
প্রবাসীরা নিজেদের জীবনের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে বিদেশে পড়ে থাকেন শুধুমাত্র তাঁদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করে মানুষ করার স্বপ্নে। প্রবাসীদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহায়তা করতে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড প্রতি বছর প্রবাসী কর্মীদের মেধাবী সন্তানদের জন্য প্রবাসী শিক্ষাবৃত্তি (Education Scholarship for Children of Expatriate Workers) এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক বঙ্গবন্ধু অভিবাসী বৃহৎ পরিবার শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করে থাকে। এ সংক্রান্ত আবেদনের পূর্ণাঙ্গ নিয়ম জানতে পড়ুন: প্রবাসীর সন্তানের শিক্ষাবৃত্তি ২০২৬: আবেদন, যোগ্যতা ও টাকার পরিমাণ।
| শিক্ষাবৃত্তির স্তর ও ক্যাটাগরি | ন্যূনতম জিপিএ (GPA) যোগ্যতা | মাসিক ও বাৎসরিক বৃত্তির হার (সেশন চার্জসহ) | বৃত্তি প্রদানের মেয়াদকাল |
|---|---|---|---|
| ১. এইচএসসি / সমমান পর্যায়ে (এসএসসি/দাখিল উত্তীর্ণদের জন্য) |
সাধারণ প্রবাসীর সন্তান: জিপিএ ৪.৮০+ মৃত প্রবাসীর সন্তান: জিপিএ ৪.০০+ |
মাসিক ২,০০০ টাকা + এককালীন বই/সেশন ভাতা ৩,৫০০ টাকা = বছরে ২৭,৫০০ টাকা | ২ বছর (একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি) |
| ২. ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং / পলিটেকনিক (এসএসসি উত্তীর্ণদের জন্য) |
সাধারণ: জিপিএ ৪.৮০+ মৃত প্রবাসীর সন্তান: জিপিএ ৪.০০+ |
মাসিক ২,০০০ টাকা + বার্ষিক সেশন ভাতা ৩,৫০০ টাকা = বছরে ২৭,৫০০ টাকা | ৪ বছর (৮ সেমিস্টার) |
| ৩. স্নাতক (সম্মান) / ডিগ্রি / ফাজিল (এইচএসসি/আলিম উত্তীর্ণদের জন্য) |
এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৮০+ (মৃত প্রবাসীর ক্ষেত্রে ৪.০০+) | মাসিক ২,৫০০ টাকা + বার্ষিক সেশন ভাতা ৪,০০০ টাকা = বছরে ৩৪,০০০ টাকা | ৪ বছর (স্নাতক পর্যায়ে) + ১ বছর (স্নাতকোত্তর পর্যায়ে) |
| ৪. মেডিকেল (MBBS/BDS), বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় | এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৮০+ এবং সরকারি/স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি | মাসিক ২,৫০০–৩,০০০ টাকা + বার্ষিক সেশন ভাতা ৪,০০০ টাকা = বছরে ৩৪,০০০–৪০,০০০ টাকা | ৪ থেকে ৫ বছর (কোর্সের মেয়াদ অনুযায়ী) |
| ৫. প্রতিবন্ধী সন্তানদের বিশেষ ভাতা (যেকোনো বয়স বা শ্রেণি) |
সমাজসেবা অধিদপ্তরের সূবর্ণ নাগরিক কার্ড / প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্র থাকা সাপেক্ষে | মাসিক ১,০০০ টাকা হারে = বছরে ১২,০০০ টাকা | টানা ৫ বছর (মোট ৬০,০০০ টাকা) |
এছাড়াও বাংলাদেশের সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত স্কুল, কলেজ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে প্রবাসীদের সন্তানদের জন্য নির্ধারিত প্রবাসী পোষ্য কোটা (NRB / Expatriate Quota) এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড পরিচালিত বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকারমূলক ভর্তির সুযোগ রয়েছে।
১১. আহত ও অসুস্থ প্রবাসীদের ১.৫ লাখ টাকা চিকিৎসা অনুদান ও ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স
সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আরব আমিরাত, ওমান বা মালয়েশিয়ার নির্মাণ খাত, কারখানা বা ভারী শিল্পে কাজ করার সময় প্রতি বছর অসংখ্য বাংলাদেশি কর্মী কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, আগুনে দগ্ধ হওয়া, উচ্চ রক্তচাপজনিত স্ট্রোক (Brain Stroke), হার্ট অ্যাটাক কিংবা কিডনি বিকল হওয়ার মতো মারাত্মক শারীরিক বিপর্যয়ের শিকার হন। অনেক সময় বিদেশের কোম্পানি প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে কর্মীকে ফিটনেস অযোগ্য ঘোষণা করে শূন্য হাতে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। এমন অবস্থায় দেশে ফিরে ব্যয়বহুল অপারেশন বা দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার খরচ চালানোর সামর্থ্য কর্মীর পরিবারের থাকে না। এই বিপদগ্রস্ত প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড পরিচালনা করছে আহত ও অসুস্থ প্রবাসী কর্মীদের আর্থিক চিকিৎসা সহায়তা তহবিল।
চিকিৎসা অনুদানের পরিমাণ ও প্রাপ্তির শর্তাবলী (২০২৬):
- সর্বোচ্চ ১,৫০,০০০ (এক লাখ পঞ্চাশ হাজার) টাকা এককালীন চিকিৎসা অনুদান: প্রবাসে কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হলে অথবা ক্যান্সার, কিডনি ডায়ালাইসিস, ওপেন হার্ট সার্জারি, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা মেরুদণ্ডের আঘাতজনিত জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশে ফেরত এলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ও হাসপাতালের ভর্তি/খরচের ভাউচার সাপেক্ষে কল্যাণ বোর্ড থেকে ৫০,০০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১,৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত অফেরতযোগ্য নগদ চিকিৎসা অনুদান প্রদান করা হয়।
- বিমানবন্দর থেকে বাড়ি বা হাসপাতালে নেওয়ার সম্পূর্ণ ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস: স্ট্রেচারে বা হুইলচেয়ারে করে কোনো গুরুতর অসুস্থ প্রবাসী ঢাকা (হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর), চট্টগ্রাম বা সিলেট বিমানবন্দরে অবতরণ করলে বিমানবন্দরে অবস্থিত প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে রিসিভ করে এবং কল্যাণ বোর্ডের নিজস্ব শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিনা ভাড়ায় ঢাকার যেকোনো বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালে অথবা দেশের যেকোনো জেলার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দেয়।
- আবেদনের সময়সীমা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র: অসুস্থ অবস্থায় দেশে ফেরার পর যত দ্রুত সম্ভব (সাধারণত ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে) পাসপোর্টের কপি (অ্যারাইভাল স্ট্যাম্পসহ), বিএমইটি স্মার্ট কার্ড বা কল্যাণ বোর্ড সদস্য কার্ড, বিদেশের হাসপাতালের ডিসচার্জ সামারি, বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের প্রত্যয়নপত্র এবং নিজের ব্যাংক একাউন্টের চেক পাতার কপিসহ অনলাইনে বা জেলা জনশক্তি অফিসে (DEMO) আবেদন করতে হয়।
১২. বিমানবন্দরে প্রবাসী লাউঞ্জ, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও ভিআইপি প্রটোকল সেবা
দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ছিল যে—যাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্সে দেশের চাকা ঘোরে, সেই প্রবাসীরাই দেশে ফেরার সময় বা বিদেশ যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে অবহেলা, লাগেজ বিড়ম্বনা এবং খাবারের দোকানে গলাকাটা দামের শিকার হন। প্রবাসীদের এই দীর্ঘদিনের কষ্ট দূর করতে এবং তাঁদের রাষ্ট্রীয় ভিআইপি মর্যাদা প্রদান করতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালু করা হয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ‘প্রবাসী লাউঞ্জ’ (Probashi Lounge) এবং ২৪ ঘণ্টা সার্বক্ষণিক প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসীদের জন্য ৬টি বিশেষ সুবিধা:
- শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশালাকার প্রবাসী লাউঞ্জ (বিশ্রাম ও ওয়েটিং জোন): বিমানবন্দরের মাল্টিলেভেল কার পার্কিং ভবনের দ্বিতীয় তলায় এবং টার্মিনাল ভবনের অভ্যন্তরে প্রবাসী কর্মী ও তাঁদের বিদায় বা স্বাগত জানাতে আসা স্বজনদের জন্য সুপরিসর বিশ্রামাগারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফ্লাইটের দীর্ঘ বিরতি বা রাতে পৌঁছানোর পর ভোর পর্যন্ত নিরাপদে অপেক্ষা করার জন্য এখানে আরামদায়ক আসন, নামাজের স্থান, ব্রেস্টফিডিং রুম ও লকার সুবিধা রয়েছে।
- সরকারি ভর্তুকি মূল্যে (মাত্র ১০০–১৫০ টাকায়) স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও পানীয়: বিমানবন্দরের ভেতরে যেখানে এক বোতল পানি বা হালকা নাস্তার দাম সাধারণ প্রবাসীদের নাগালের বাইরে থাকে, সেখানে প্রবাসী লাউঞ্জে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তত্ত্বাবধানে নামমাত্র সরকারি নির্ধারিত মূল্যে (বাজারমূল্যের সমান বা ভর্তুকি দামে) খিচুড়ি, বিরিয়ানি, পরোটা-ভাজি, চা-কফি ও বিশুদ্ধ খাবার পানি পরিবেশন করা হয়।
- ফ্রি হাই-স্পিড ওয়াই-ফাই (Wi-Fi) ও ফ্রি টেলিফোন বুথ: বিদেশ থেকে নামার পর অনেকের সাথে বাংলাদেশি সচল সিম কার্ড থাকে না, ফলে বাইরে অপেক্ষমাণ পরিবারকে ফোন করতে গিয়ে দালালদের খপ্পরে পড়েন। প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কে প্রবাসীদের জন্য সম্পূর্ণ ফ্রি ওয়াই-ফাই পাসওয়ার্ড এবং দেশে স্বজনদের সাথে কথা বলার জন্য ফ্রি মোবাইল/টেলিফোন কলের ব্যবস্থা রয়েছে।
- ইমিগ্রেশন ও বোর্ডিং কার্ড পূরণে ডেডিকেটেড ভলান্টিয়ার সহায়তা: প্রথমবার বিদেশগামী যেসব কর্মী ইংরেজি ফরম পূরণ করতে বা বোর্ডিং গেট খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েন, তাঁদের হাত ধরে ইমিগ্রেশন কাউন্টার পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের ইউনিফর্মধারী সহায়ক কর্মীরা ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করেন।
- হারানো লাগেজ ট্র্যাকিং ও কাস্টমস সহায়তা সেল: এয়ারলাইন্সে প্রবাসীর বুকিং দেওয়া লাগেজ মিসিং হলে লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড (Lost & Found) ডকেট খোলা এবং পরবর্তীতে লাগেজ বাড়িতে পাঠানোর তদারকিতে প্রবাসী ডেস্ক সরাসরি সহায়তা করে।
- আউটপাস বা ডিপোর্টেড কর্মীদের বাড়ি ফেরার নগদ যাতায়াত ভাড়া: বিদেশ থেকে শূন্য হাতে বা ট্রাভেল পারমিটে (Outpass) ফেরত আসা অসহায় কর্মীদের বিমানবন্দরে খাবার এবং নিজ জেলায় বাড়ি ফেরার জন্য নগদ বাস/ট্রেন ভাড়া প্রদান করা হয়।
১৩. শুল্কমুক্ত ব্যাগেজ রুলস ২০২৬: স্বর্ণ, মোবাইল ফোন ও টিভি আনার সরকারি সুবিধা
ছুটিতে দেশে ফেরার সময় প্রতিটি প্রবাসীরই ইচ্ছা থাকে পরিবারের সদস্যদের জন্য স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, টেলিভিশন, কসমেটিকস এবং স্ত্রী বা মায়ের জন্য সামান্য স্বর্ণালংকার নিয়ে আসা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)-এর যাত্রী (অপর্যটক) ব্যাগেজ বিধিমালা (Passenger Non-Tourist Baggage Rules) এবং প্রবাসী বিশেষ সুবিধার আওতায় বৈধ প্রবাসীরা কাস্টমস শুল্ক ছাড়াই (Duty-Free) অথবা বিশেষ হ্রাসকৃত শুল্কে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য দেশে আনতে পারেন। বিমানবন্দরে কাস্টমস হয়রানি ও জরিমানা এড়াতে ২০২৬ সালের হালনাগাদ ব্যাগেজ রুলস জানা অত্যন্ত জরুরি।
| পণ্যের নাম ও বিবরণ | শুল্কমুক্ত (বিনা ট্যাক্সে) আনার সীমা | শুল্ক পরিশোধ সাপেক্ষে অতিরিক্ত আনার সীমা | গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও বিএমইটি সুবিধা |
|---|---|---|---|
| ১. স্মার্টফোন / মোবাইল হ্যান্ডসেট | ব্যক্তিগত ব্যবহারের ২টি ব্যবহৃত (খোলা) ফোন সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত (বিএমইটি কার্ডধারী প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সুবিধায় অতিরিক্ত ১টিসহ মোট ৩টি পর্যন্ত বিবেচনাযোগ্য) | নির্ধারিত কাস্টমস শুল্ক পরিশোধ করে আরও ১টি নতুন ফোন আনা যাবে | বৈধ রেমিট্যান্স ও বিএমইটি স্মার্ট কার্ড থাকলে বিটিআরসি (BTRC) পোর্টালে বিনা খরচে আইএমইআই (IMEI) নিবন্ধন সুবিধা |
| ২. স্বর্ণালংকার (Gold Ornaments) | সর্বোচ্চ ১০০ গ্রাম (প্রায় সাড়ে ৮ ভরি) পর্যন্ত স্বর্ণালংকার সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত | একই ডিজাইনের ১২টির বেশি অলংকার আনা যাবে না (বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য গণ্য হবে) | ২৪ ক্যারেট কাঁচা সোনা নয়, শুধুমাত্র পরিধেয় অলংকার হতে হবে |
| ৩. স্বর্ণের বার বা পিণ্ড (Gold Bar) | শুল্কমুক্ত নয় (কাস্টমস ট্যাক্স প্রযোজ্য) | সর্বোচ্চ ১১৭ গ্রাম (১০ ভরি) ওজনের ১টি বা ২টি স্বর্ণের বার নির্ধারিত শুল্ক (প্রতি ভরিতে প্রায় ৪,০০০–৫,০০০ টাকা) দিয়ে আনা যাবে | বিমানবন্দরের গ্রীন চ্যানেল পার হওয়ার আগে কাস্টমস ডিক্লারেশন ফরমে ঘোষণা দেওয়া বাধ্যতামূলক |
| ৪. ল্যাপটপ, ট্যাবলেট ও ক্যামেরা | ব্যক্তিগত ব্যবহারের ১টি ল্যাপটপ/নোটবুক, ১টি আইপ্যাড/ট্যাব এবং ১টি ডিজিটাল ক্যামেরা সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত | অতিরিক্ত নতুন ল্যাপটপ আনলে নির্ধারিত শুল্ক প্রযোজ্য | বাক্স খোলা বা ব্যবহৃত অবস্থায় হ্যান্ডব্যাগে বহন করা উত্তম |
| ৫. টেলিভিশন (LED / Smart TV) | ২৯ ইঞ্চি পর্যন্ত ১টি এলইডি টিভি সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত | ৩০ ইঞ্চি থেকে ৬৫+ ইঞ্চি টিভির ক্ষেত্রে ইঞ্চিভেদে নির্ধারিত কাস্টমস শুল্ক (১০,০০০ টাকা থেকে ৯০,০০০ টাকা) প্রযোজ্য | বিএমইটি কার্ডধারী প্রবাসীরা বছরে নির্দিষ্টসংখ্যক ঘরের গৃহস্থালি ইলেকট্রনিক্স পণ্য সুবিধা পান |
১৪. এনআরবি সিআইপি (CIP) কার্ড, রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা
প্রতি বছর ১৮ ডিসেম্বর ‘আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস’ এবং ৩০ ডিসেম্বর ‘জাতীয় প্রবাসী দিবস’ উপলক্ষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বৈধ চ্যানেলে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রেরণকারী, বাংলাদেশে শিল্পখাতে বিনিয়োগকারী এবং বাংলাদেশি পণ্য বিদেশে আমদানিকারক প্রবাসীদের দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ বা এনআরবি সিআইপি (Commercially Important Person - NRB CIP) মর্যাদায় ভূষিত করে। এছাড়াও সাধারণ রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের উৎসাহিত করতে দূতাবাস ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড এবং প্রবাসী প্রিভিলেজ কার্ড প্রদান করা হয়।
একজন এনআরবি সিআইপি (NRB CIP) কার্ডধারী প্রবাসী সরকার থেকে কী কী ভিআইপি সুবিধা পান?
- সচিবালয়ে প্রবেশের বিশেষ পাস ও গাড়ির স্টিকার: সিআইপি কার্ডের মেয়াদকালীন (২ বছর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে বিনা বাধায় প্রবেশের জন্য বিশেষ প্রবেশপত্র এবং নিজের গাড়ির জন্য সরকারি ভিআইপি স্টিকার প্রদান করা হয়।
- বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জ (চামেলী) ব্যবহারের সুবিধা: নিজে এবং নিজের স্ত্রী-সন্তানসহ দেশ-বিদেশে ভ্রমণের সময় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রাষ্ট্রীয় ভিআইপি লাউঞ্জ (VIP Lounge - Chameli) এবং স্পেশাল ইমিগ্রেশন কাউন্টার ব্যবহারের অধিকার।
- বিমান, রেল ও সড়কপথে প্রথম শ্রেণির কেবিন/আসন সংরক্ষণ অগ্রাধিকার: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং সরকারি জলযানে টিকিট বুকিংয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
- সরকারি হাসপাতালে কেবিন সুবিধা ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ: নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (BSMMU) ও সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভিআইপি কেবিন বরাদ্দ এবং জাতীয় দিবস ও নাগরিক সংবর্ধনায় রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণ।
১৫. বিপদগ্রস্ত নারী প্রবাসীদের সেফ হোম (Safe Home), উদ্ধার ও ফ্রি দেশে ফেরা
সৌদি আরব, জর্ডান, ওমান, লেবানন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে কয়েক লাখ বাংলাদেশি নারী কর্মী গৃহকর্মী (Housemaid), গার্মেন্টস অপারেটর এবং ক্লিনার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। কখনো কখনো বিদেশের নিয়োগকর্তা বা কফিলের বাড়িতে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, চুক্তিমতো বেতন না দেওয়া কিংবা পাসপোর্ট আটকে রাখার মতো চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। বিপদগ্রস্ত নারী কর্মীদের তাৎক্ষণিক উদ্ধার, নিরাপদ আশ্রয় ও বিনা খরচে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বিশেষ নারী সুরক্ষা সেল ও সেফ হোম (Safe Home) পরিচালনা করে।
বিপদগ্রস্ত নারী প্রবাসীদের জন্য সরকারের ৫টি বিশেষ জরুরি সেবা:
- দূতাবাসের অধীনে সার্বক্ষণিক ‘সেফ হোম’ (Shelter Home): সৌদি আরবের রিয়াদ ও জেদ্দা, ওমানের মাস্কাট, জর্ডানের আম্মান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ প্রধান শ্রমবাজারগুলোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষিত সেফ হোম রয়েছে। কোনো নারী কর্মী কর্মস্থলে নির্যাতনের শিকার হয়ে দূতাবাসের হটলাইনে বা ১৬১৩৫ নম্বরে কল করলে স্থানীয় পুলিশ ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় তাঁকে উদ্ধার করে সেফ হোমে আনা হয়।
- বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া, চিকিৎসা ও মানসিক কাউন্সিলিং: সেফ হোমে অবস্থানকালে নারী কর্মীদের সম্পূর্ণ সরকারি খরচে তিন বেলা খাবার, পোশাক, নারী চিকিৎসকের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা এবং ট্রমা কাটানোর জন্য মনোসামাজিক কাউন্সিলিং দেওয়া হয়।
- বকেয়া বেতন উদ্ধার ও এক্সিট ভিসা প্রসেসিং: দূতাবাসের শ্রম উইং কফিল বা রিক্রুটিং এজেন্সিকে তলব করে কর্মীর বকেয়া বেতন আদায় করে এবং পাসপোর্ট না থাকলেও ফ্রি আউটপাস (Travel Permit) ও ফাইনাল এক্সিট ভিসার ব্যবস্থা করে।
- সরকারি খরচে বিমানের টিকিট ও দেশে প্রত্যাবাসন: যেসব নির্যাতিত বা অসুস্থ নারী কর্মীর বিমানের টিকিট কেনার সামর্থ্য নেই, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তহবিল থেকে তাঁদের সম্পূর্ণ ফ্রি বিমান টিকিট দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
- দেশে ফেরার পর শেল্টার হোম, আইনি ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন অনুদান: ঢাকা বিমানবন্দরে নামার পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে তাঁদের রিসিভ করে পরিবারের কাছে নিরাপদে হস্তান্তর করা হয়, দায়ী রিক্রুটিং এজেন্সির জামানত বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয় এবং স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য রাইজ (RAISE) প্রকল্প ও বিশেষ অনুদান প্রদান করা হয়।
১৬. বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের রাইজ (RAISE) প্রকল্প, ১৩,৫০০ টাকা ভাতা ও RPL সনদ
কোভিড-১৯ পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত যেসব প্রবাসী কর্মী কাজ হারিয়ে, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে অথবা কোম্পানির সমস্যার কারণে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে এসেছেন (Returnee Migrants), তাঁদের পুনরায় সমাজের মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বাস্তবায়ন করছে ‘রিকভারি অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট (RAISE): রিইন্টিগ্রেশন অব রিটার্নি মাইগ্রেন্টস’ প্রকল্প।
বিদেশ ফেরত প্রবাসীরা রাইজ (RAISE) প্রকল্প ও বিএমইটি থেকে কী কী সুবিধা পাচ্ছেন?
- নগদ ১৩,৫০০ টাকা পুনর্বাসন প্রণোদনা (Cash Incentive): ২০১৫ সালের পর বিদেশ থেকে স্থায়ীভাবে ফেরত আসা কর্মীরা দেশের ৩২টি জেলায় স্থাপিত ওয়েলফেয়ার সেন্টার (Welfare Center)-এ নিবন্ধন করে সংক্ষিপ্ত ওরিয়েন্টেশন ও উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করলেই সরাসরি তাঁদের ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ/নগদ) হিসাবে অফেরতযোগ্য ১৩,৫০০ (তেরো হাজার পাঁচশত) টাকা নগদ ভাতা প্রদান করা হচ্ছে।
- পূর্ব অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি বা আরপিএল (Recognition of Prior Learning - RPL) সনদ: অনেক প্রবাসী বিদেশে ৫–১০ বছর ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, ওয়েল্ডার, এসি টেকনিশিয়ান, রাজমিস্ত্রি বা শেফ হিসেবে কাজ করে দক্ষ হয়েছেন, কিন্তু তাঁদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট নেই। বিএমইটি-র টিটিসি (TTC) কেন্দ্রগুলোতে মাত্র ৩ দিনের অ্যাসেসমেন্ট পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তাঁরা সরকারি RPL দক্ষতা সনদ (NTVQF Level 1–3) পেতে পারেন—যা দিয়ে দেশে ভালো চাকরি বা পুনরায় উচ্চ বেতনে ইউরোপ/জাপানে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
- প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ও এনজিও থেকে সহজ শর্তে ব্যবসা ঋণ রেফারেল: রাইজ প্রকল্পে নিবন্ধিত কর্মীদের প্রোফাইল সরাসরি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, এসএমই ফাউন্ডেশন ও পিকেএসএফ (PKSF)-এর কাছে রেফার করা হয়, যাতে তাঁরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৪% থেকে ৯% সুদে কৃষি, ডেইরি ফার্ম, পোল্ট্রি বা ক্ষুদ্র ব্যবসার লোন পান।
১৭. বিদেশে ফ্রি আইনি সহায়তা, বকেয়া বেতন উদ্ধার ও রক্তমূল্য (দিয়াত) আদায়
প্রবাসের মাটিতে ভাষা না জানা এবং স্থানীয় শ্রম আইন সম্পর্কে ধারণা না থাকার কারণে অনেক বাংলাদেশি কর্মী কফিল বা কোম্পানির মিথ্যা হুরুব (Absconding) মামলা, মাসের পর মাস বেতন বকেয়া রাখা কিংবা অন্যায়ভাবে জেলখানায় আটকের শিকার হন। আবার বিদেশে কর্মরত অবস্থায় কারও মৃত্যু হলে তাঁর সার্ভিস বেনিফিট (End of Service Gratuity), ইন্স্যুরেন্সের টাকা এবং দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুতে শরিয়াহ আইন অনুযায়ী নির্ধারিত রক্তমূল্য বা দিয়াত (Diya / Blood Money — যা সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৩০ লাখ থেকে ৯০ লাখ বাংলাদেশি টাকার সমান) আদায় করার জন্য স্থানীয় আদালতে দীর্ঘ আইনি লড়াই করতে হয়।
প্রবাসীদের জন্য সরকারি আইনি সহায়তা যেভাবে কাজ করে:
- দূতাবাসে ফ্রি আইনজীবী ও দোভাষী (Legal Aid & Interpreter) সুবিধা: ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড প্রতি বছর সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আরব আমিরাত, ওমান, মালয়েশিয়া ও বাহরাইনের বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে কোটি কোটি টাকা তহবিল বরাদ্দ দেয় শুধুমাত্র প্রবাসীদের পক্ষে স্থানীয় শ্রম আদালত (Labour Court) ও ফৌজদারি আদালতে লড়ার জন্য প্যানেল আইনজীবী ও আরবি/স্থানীয় ভাষার দোভাষী নিয়োগের উদ্দেশ্যে।
- মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ, ইন্স্যুরেন্স ও বকেয়া বেতন আদায় সেল: বিদেশে নিহত বা মৃত প্রবাসীর পরিবারের পক্ষ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (Power of Attorney) ও ওয়ারিশ সনদ নিয়ে দূতাবাস স্থানীয় আদালত থেকে বকেয়া বেতন ও দিয়াতের চেক সংগ্রহ করে। এই টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে আসে এবং বোর্ড এক টাকাও সার্ভিস চার্জ না কেটে শতভাগ অর্থ সরাসরি মৃতের পরিবারের হাতে চেক বা ইএফটি মারফত তুলে দেয়।
- দেশে রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে সালিশ ও ক্ষতিপূরণ আদায়: কোনো বৈধ বা অবৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি যদি ভালো কাজের কথা বলে বিদেশে পাঠিয়ে প্রতারণা করে, তবে ভুক্তভোগী কর্মী বা তাঁর পরিবার বিএমইটি-র অভিযোগ ও নিষ্পত্তি সেল (Complaint Management Cell) অথবা প্রবাসী অধিকার ও অভিযোগ পোর্টালে আবেদন করলে সরকারিভাবে সালিশ বসিয়ে এজেন্সির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা আদায় করে দেওয়া হয়।
১৮. রাজউক ও সরকারি আবাসন প্লট/ফ্ল্যাটে প্রবাসী কোটা এবং শেয়ার বাজার IPO সুবিধা
প্রবাসীদের একটি স্থায়ী ঠিকানা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার সরকারি আবাসন প্রকল্প এবং পুঁজিবাজারে (Stock Market) প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সংরক্ষিত কোটা বা NRB Quota চালু রেখেছে। অনেক প্রবাসী দালাল বা ভুয়া ডেভেলপার কোম্পানির কাছে ফ্ল্যাট বা প্লট কিনতে গিয়ে প্রতারিত হন, অথচ সরকারি আবাসন প্রকল্পগুলোতে আবেদন করলে বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে এবং শতভাগ নিষ্কণ্টক মালিকানায় প্লট বা ফ্ল্যাট পাওয়া সম্ভব।
আবাসন ও পুঁজিবাজারে প্রবাসীদের ৩টি বিশেষ সরকারি সুবিধা:
- রাজউক (RAJUK), জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ও সিডিএ/কেডিএ প্রকল্পে সংরক্ষিত ‘প্রবাসী কোটা’: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর পূর্বাচল, উত্তরা ও ঝিলমিল প্রকল্পসহ জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (NHA) এবং চট্টগ্রাম/খুলনা/রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের যেকোনো আবাসিক প্লট বা অ্যাপার্টমেন্ট বরাদ্দের লটারিতে প্রবাসীদের জন্য নির্দিষ্ট শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী (Wage Earner / NRB) কোটা সংরক্ষিত থাকে। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর সনদ থাকলে এই কোটায় আবেদন করে সহজেই সরকারি প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাওয়া যায়।
- শেয়ার বাজারের প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও (IPO)-তে ১০% সংরক্ষিত NRB কোটা: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC)-এর বিধিমালা অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে যখনই কোনো নতুন ভালো কোম্পানি বা ব্যাংক প্রাথমিক শেয়ার (IPO - Initial Public Offering) ছাড়ে, তখন তার মোট শেয়ারের একটি নির্দিষ্ট অংশ (সাধারণত ১০% এনআরবি কোটা) শুধুমাত্র প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। প্রবাসীরা তাঁদের এনআরবি ব্যাংক একাউন্ট ও বিও (BO - Beneficiary Owner) একাউন্টের মাধ্যমে বিদেশে বসেই আইপিও শেয়ার কিনে নিশ্চিত মুনাফা অর্জন করতে পারেন।
- রেমিট্যান্সের টাকায় ফ্ল্যাট/জমি ক্রয়ে উৎস কর ও নিবন্ধন সুবিধা: বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রেরিত রেমিট্যান্সের এনক্যাশমেন্ট সার্টিফিকেট প্রদর্শন করে দেশে জমি বা ফ্ল্যাট কিনলে আয়কর রিটার্নে অর্থের উৎস নিয়ে কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় না।
১৯. প্রবাস বন্ধু কল সেন্টার (১৬১৩৫), অনলাইন অভিযোগ ও দূতাবাস শ্রম উইং
যেকোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য জানতে, বিদেশে বিপদে পড়লে উদ্ধারের আবেদন জানাতে কিংবা দালাল বা এজেন্সির বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ দায়ের করতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড পরিচালনা করছে ২৪ ঘণ্টা সার্বক্ষণিক ‘প্রবাস বন্ধু কল সেন্টার’ (Probash Bondhu Call Center)। ২০২৬ সালে এই হেল্পলাইনটি দেশ ও বিদেশ থেকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও টোল-ফ্রি প্রযুক্তির সাথে যুক্ত করা হয়েছে।
| যোগাযোগের মাধ্যম ও চ্যানেল | অফিশিয়াল নম্বর / ঠিকানা | কারা ও কীভাবে ব্যবহার করবেন | সেবার সময়কাল ও চার্জ |
|---|---|---|---|
| ১. জাতীয় টোল-ফ্রি শর্টকোড (দেশ থেকে) | ১৬১৩৫ (16135) | বাংলাদেশের যেকোনো মোবাইল অপারেটর বা ল্যান্ডফোন থেকে সরাসরি কল করা যাবে | ২৪ ঘণ্টা (সপ্তাহে ৭ দিন) — সম্পূর্ণ ফ্রি (টোল-ফ্রি) |
| ২. আন্তর্জাতিক হটলাইন (বিদেশ থেকে) | +৮৮০ ৯৬১০ ১০২০৩০ (+880 9610 102030) | সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, দুবাই, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে সরাসরি কল | ২৪ ঘণ্টা খোলা (সাধারণ আন্তর্জাতিক কল রেট প্রযোজ্য) |
| ৩. হোয়াটসঅ্যাপ ও ইমো (WhatsApp / IMO) | +৮৮০ ১৭৮৪ ৩৩৩৩৩৩ / +৮৮০ ১৭৯৪ ৩৩৩৩৩৩ | বিদেশ থেকে ভয়েস মেসেজ, পাসপোর্ট/ভিসার ছবি ও লোকেশন পাঠিয়ে সাহায্য চাওয়ার জন্য | সার্বক্ষণিক মেসেজিং ও কল সাপোর্ট |
| ৪. অফিশিয়াল ইমেইল ও ওয়েব পোর্টাল | info@wewb.gov.bdcomplain.bmet.gov.bd |
লিখিত অভিযোগ, মৃত্যু অনুদান ও শিক্ষাবৃত্তির আবেদনের স্ট্যাটাস জানার জন্য | অনলাইনে ২৪ ঘণ্টা আবেদন গ্রহণ |
| ৫. ঢাকা বিমানবন্দর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক | হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (টার্মিনাল ১, ২ ও ৩) | অসুস্থ কর্মী রিসিভ, মরদেহের ৩৫,০০০ টাকা অনুদান ও ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স বুকিং | ২৪ ঘণ্টা (৩ শিফটে সার্বক্ষণিক খোলা) |
২০. সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অনলাইন আবেদন পোর্টাল ও দালালমুক্ত চেকলিস্ট
অতীতে সরকারি অনুদান, শিক্ষাবৃত্তি বা প্রবাসী লোন পেতে হলে প্রবাসীর পরিবারকে দিনের পর দিন বিভিন্ন অফিসে ঘুরতে হতো এবং অসাধু দালালরা “ফাইল পাস করিয়ে দেওয়ার” নাম করে অনুদানের ২০% থেকে ৩০% টাকা হাতিয়ে নিত। কিন্তু ২০২৬ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রবাসী কল্যাণের প্রায় শতভাগ সেবা সম্পূর্ণ অনলাইন এবং ক্যাশলেস (EFT Bank Transfer) করে দিয়েছে। এখন আর কোনো সেবার জন্যই দালালের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই; সরকারি অনুদানের টাকা সরাসরি প্রবাসী বা তাঁর পরিবারের ব্যাংক একাউন্টে জমা হয়।
কোন সরকারি সুবিধার জন্য কোন অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে আবেদন করবেন? (মাস্টার চেকলিস্ট):
| সরকারি সুবিধার নাম | অনলাইন আবেদন পোর্টাল / অ্যাপ | আবেদনের জন্য প্রধান যে ৩টি কাগজ লাগবে | বিস্তারিত গাইড লিংক |
|---|---|---|---|
| ১. ওয়েজ আর্নার্স মেম্বারশিপ কার্ড ও যাচাই | member.wewb.gov.bd |
পাসপোর্ট কপি, বৈধ ভিসা/আকামা কপি ও পাসপোর্ট সাইজ ছবি | কল্যাণ বোর্ড কার্ড গাইড |
| ২. মৃত প্রবাসীর ৩.৩৫ লাখ টাকা অনুদান ও মরদেহ আনা | wewb.gov.bd / নিকটস্থ DEMO অফিস |
ডেথ সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট কপি, চেয়ারম্যানের ওয়ারিশ সনদ ও ব্যাংক হিসাব | মৃত্যু অনুদান ও লাশ আনা গাইড |
| ৩. প্রবাসীর সন্তানের শিক্ষাবৃত্তি আবেদন | portal.wewb.gov.bd |
এসএসসি/এইচএসসি মার্কশিট, প্রতিষ্ঠান প্রধানের প্রত্যয়ন ও পিতার বিএমইটি/সদস্য কার্ড | প্রবাসী শিক্ষাবৃত্তি গাইড |
| ৪. প্রবাসী এনআরবি (NRB) ব্যাংক একাউন্ট খোলা | সোনালী ই-ওয়ালেট / সেলফিন / আস্থা অ্যাপ | বৈধ পাসপোর্ট, আকামা/ওয়ার্ক পারমিট, লাইভ সেলফি ও নমিনির এনআইডি | এনআরবি একাউন্ট গাইড |
| ৫. ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড ক্রয় (১২% মুনাফা) | এডি (AD) ব্যাংক শাখা / এক্সচেঞ্জ হাউজ | পাসপোর্ট, ভিসা/আকামা কপি, এনআরবি/এফসি একাউন্ট ও বৈধ রেমিট্যান্স ভাউচার | ওয়েজ আর্নার বন্ড গাইড |
| ৬. ২.৫% রেমিট্যান্স প্রণোদনা ও ট্যাক্স সার্টিফিকেট | বৈধ এক্সচেঞ্জ হাউজ / ব্যাংক / বিকাশ | প্রাপকের সঠিক এনআইডি ও ব্যাংক/মোবাইল ওয়ালেট নম্বর (কাগজপত্র লাগে না) | ২.৫% রেমিট্যান্স বোনাস গাইড |
| ৭. প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক লোন (অভিবাসন ও পুনর্বাসন) | pkb.gov.bd / Ami Probashi অ্যাপ |
আসল ভিসা ও চুক্তিপত্র, বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন এবং ২ জন সচ্ছল জামিনদারের কাগজ | প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক লোন গাইড |
| ৮. সর্বজনীন পেনশন ‘প্রবাস’ স্কিম নিবন্ধন | upension.gov.bd |
জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা পাসপোর্ট নম্বর, মোবাইল নম্বর ও নমিনির তথ্য | অধ্যায় ৭ দেখুন |
প্রবাসীদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা আদায়ে বিভাগ ও জেলাভিত্তিক সহায়তা কেন্দ্রের তালিকা (DEMO ও ওয়েলফেয়ার সেন্টার):
বাংলাদেশের গ্রাম বা মফস্বল শহরে বসবাসরত প্রবাসীদের পরিবারগুলো যাতে ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ ভবনে না এসেও নিজ জেলাতেই মৃত্যু অনুদান, শিক্ষাবৃত্তি, চিকিৎসা সহায়তা, বীমা দাবি এবং রাইজ (RAISE) প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন, সেজন্য দেশের প্রতিটি বিভাগে জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস (DEMO) এবং ওয়েলফেয়ার সেন্টারগুলোতে বিশেষ হেল্পডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে। নিচে বিভাগওয়ারী আঞ্চলিক কেন্দ্র ও সেবার পরিধি তুলে ধরা হলো:
| বিভাগীয় অঞ্চল | প্রধান জেলা জনশক্তি অফিস (DEMO) ও ওয়েলফেয়ার সেন্টার | যেসব সরকারি সেবা সরাসরি গ্রহণ করা যায় | প্রয়োজনীয় দলিলাদি জমার নিয়ম |
|---|---|---|---|
| ১. ঢাকা বিভাগ | ঢাকা (কাকরাইল/ইস্কাটন), গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ ও গোপালগঞ্জ | বিএমইটি ফিঙ্গারপ্রিন্ট, মৃত্যু অনুদানের ৩ লাখ টাকার চেক/ইএফটি ভেরিফিকেশন, প্রবাসী কর্মী বীমা দাবি (১০ লাখ টাকা), চিকিৎসা অনুদান ও রাইজ প্রকল্পের ১৩,৫০০ টাকা ভাতা | অনলাইনে আবেদনের পর মূল ওয়ারিশ সনদ, পাসপোর্ট কপি ও ব্যাংক এমআইসিআর (MICR) চেক পাতার কপি সরাসরি ডেস্কে প্রদর্শন |
| ২. চট্টগ্রাম বিভাগ | চট্টগ্রাম (আগ্রাবাদ), কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুর ও রাঙ্গামাটি | শাহ আমানত বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণ ও ৩৫,০০০ টাকা দাফন খরচ, ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স বুকিং, শিক্ষাবৃত্তি ভেরিফিকেশন এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক লোন রেফারেল | ইউনিয়ন/পৌরসভার চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্র, প্রবাসীর বিএমইটি স্মার্ট কার্ড বা কল্যাণ বোর্ড মেম্বারশিপ সনদ |
| ৩. সিলেট বিভাগ | সিলেট (আলমপুর), মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ | ওসমানী বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক সেবা, যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীদের সম্পত্তি ও আইনি সহায়তা সেল, এনআরবি বন্ড ও ব্যাংকিং পরামর্শ | সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ হাইকমিশন/দূতাবাসের এনওসি বা আউটপাস কপি এবং জাতীয় পরিচয়পত্র |
| ৪. রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ | বগুড়া, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও ঠাকুরগাঁও | স্বল্পোন্নত জেলা কোটায় সরকারিভাবে বোয়েসেল (BOESL)-এর মাধ্যমে বিদেশ গমন, টিটিসি কারিগরি প্রশিক্ষণ ও বিনা জামানতে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক অভিবাসন লোন | আসল ভিসা ও চাকরির চুক্তিপত্র, টিটিসি সনদ এবং পরিবারের ২ জন জামিনদারের জাতীয় পরিচয়পত্র |
| ৫. খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগ | খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও নেত্রকোনা | প্রত্যাগত নারী ও পুরুষ কর্মীদের রাইজ (RAISE) প্রকল্প নিবন্ধন, আরপিএল (RPL) দক্ষতা সনদ পরীক্ষা, প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা ও মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ (দিয়াত) বিতরণ | বিদেশ ফেরত পাসপোর্টের অ্যারাইভাল সিল কপি, ব্যাংক হিসাব নম্বর ও অনলাইন নিবন্ধন স্লিপ |
বৈধ প্রবাসী বনাম অনিবন্ধিত (ভিজিট বা ফ্রি ভিসা) প্রবাসীদের সরকারি সুবিধার তুলনামূলক পার্থক্য:
অনেক প্রবাসী ভাই ও বোন প্রশ্ন করেন—যাঁরা দেশ থেকে বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স না নিয়ে ট্যুরিস্ট ভিসা, ওমরাহ ভিসা বা স্টুডেন্ট ভিসায় বিদেশে গিয়ে পরবর্তীতে সেখানে কাজের ভিসা লাগিয়েছেন অথবা যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাঁরা কি সরকারের এই সুযোগ-সুবিধাগুলো পাবেন? নিচে বৈধ বিএমইটি কার্ডধারী এবং বিদেশে অবস্থানরত অনিবন্ধিত প্রবাসীদের প্রাপ্য সুবিধার আইনগত অবস্থান সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
- মরদেহ দেশে আনা ও বিমানবন্দরের ৩৫,০০০ টাকা সহায়তা: মানবিক বিবেচনায় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এবং বাংলাদেশ দূতাবাস বৈধ বিএমইটি কার্ডধারী কর্মীদের পাশাপাশি বিদেশে মৃত্যুবরণকারী অসহায় ও নিঃস্ব অনিবন্ধিত বাংলাদেশি কর্মীদের মরদেহও সরকারি খরচে দেশে আনার ব্যবস্থা করে এবং বিমানবন্দরে দাফন খরচের জন্য ৩৫,০০০ টাকা ও ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স প্রদান করে।
- ৩ লাখ টাকা মৃত্যু অনুদান, শিক্ষাবৃত্তি ও ১.৫ লাখ টাকা চিকিৎসা সহায়তা: এই তিনটি সুবিধা পাওয়ার জন্য কর্মীর অবশ্যই বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স (স্মার্ট কার্ড) অথবা বিদেশে বসে করা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড মেম্বারশিপ কার্ড (WEWB Membership) থাকতে হবে। তবে কোনো অনিবন্ধিত প্রবাসী যদি বিদেশে থাকা অবস্থায়
member.wewb.gov.bdপোর্টালে নিবন্ধন করে দূতাবাসে এককালীন কল্যাণ ফি জমা দিয়ে সদস্যপদ নিয়ে রাখেন, তবে তিনিও বৈধ বিএমইটি কার্ডধারীদের সমান শতভাগ সুবিধা (৩ লাখ টাকা মৃত্যু অনুদান ও সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি) পাবেন! - ২.৫% রেমিট্যান্স প্রণোদনা ও আয়কর অব্যাহতি: বিদেশে কর্মীর ভিসার ধরন যা-ই হোক না কেন, তিনি যদি বৈধ এক্সচেঞ্জ হাউজ বা ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশে পরিবারের ব্যাংক একাউন্টে বা বিকাশে টাকা পাঠান, তবে শতভাগ ক্ষেত্রেই তিনি ২.৫% নগদ সরকারি বোনাস এবং আয়করমুক্ত রেমিট্যান্স সার্টিফিকেট লাভ করবেন।
- প্রবাসী কর্মী জীবন বীমা (১০ লাখ টাকা): এই সুবিধাটি শুধুমাত্র যাঁরা দেশ থেকে বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স নেওয়ার সময় অথবা কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে জীবন বীমা কর্পোরেশনের নির্ধারিত প্রিমিয়াম জমা দিয়ে বীমা পলিসি গ্রহণ করেছেন, তাঁদের পলিসির মেয়াদকাল (৫ বছর) পর্যন্ত প্রযোজ্য থাকে।
প্রবাস জীবনের ৩টি পর্যায়ে (যাওয়ার আগে, প্রবাসে থাকাকালীন ও দেশে ফেরার পর) করণীয় রোডম্যাপ:
একজন দূরদর্শী রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে সরকারি সুযোগ-সুবিধাগুলোর শতভাগ সুফল পেতে আপনার প্রবাস জীবনকে তিনটি ধাপে ভাগ করে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা উচিত:
- প্রথম ধাপ — বিদেশ যাওয়ার আগে (Pre-Departure Stage): দালাল বা এজেন্সির মাধ্যমে পাসপোর্ট ও ভিসা প্রসেসিং করলেও নিজে উপস্থিত থেকে টিটিসি (TTC)-তে ৩ দিনের প্রাক-বহির্গমন ওরিয়েন্টেশন (PDO) ক্লাস সম্পন্ন করুন, নিজের নামে একটি প্রবাসী ব্যাংক একাউন্ট (NRB Account) খুলুন, উচ্চ সুদে মহাজনি ঋণ না নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ৯% সুদে অভিবাসন লোন নিন এবং ফ্লাইটের আগে অবশ্যই বিএমইটি স্মার্ট কার্ড ও ১০ লাখ টাকার প্রবাসী কর্মী বীমা পলিসির কপি পরিবারের কাছে সংরক্ষণ করে যান।
- দ্বিতীয় ধাপ — বিদেশে কর্মরত থাকাকালীন (During Overseas Employment): কখনোই হুন্ডিতে টাকা পাঠাবেন না; সর্বদা নিজের বা পরিবারের ব্যাংক একাউন্টে টাকা পাঠিয়ে ২.৫% সরকারি প্রণোদনা ও ট্যাক্স এনক্যাশমেন্ট সনদ সংগ্রহ করুন। সঞ্চয়ের টাকা অলস ফেলে না রেখে ১২% করমুক্ত মুনাফার ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড কিনুন এবং বৃদ্ধ বয়সের নিরাপত্তার জন্য মাসে অন্তত ২,০০০ বা ৫,০০০ টাকা সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রবাস’ স্কিমে জমা দিন। আপনার সন্তান এসএসসি বা এইচএসসি পাস করলে প্রতি বছর কল্যাণ বোর্ডের শিক্ষাবৃত্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করান।
- তৃতীয় ধাপ — স্থায়ীভাবে দেশে ফেরার পর (Post-Return Reintegration): প্রবাস থেকে চূড়ান্তভাবে দেশে ফিরে আসার পর জেলা ওয়েলফেয়ার সেন্টারে গিয়ে রাইজ (RAISE) প্রকল্পে নিবন্ধন করে ১৩,৫০০ টাকা নগদ ভাতা নিন, বিদেশে অর্জিত কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিএমইটি থেকে আরপিএল (RPL) সনদ সংগ্রহ করুন এবং নিজের জমানো অর্থ একসাথে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায় না খাটিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে পুনর্বাসন ঋণ ও কারিগরি পরামর্শ নিয়ে টেকসই কৃষি, ডেইরি বা ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তুলুন।
একজন প্রবাসী ও তাঁর পরিবারের ৫ বছরের আর্থিক সুরক্ষা ও সরকারি সুবিধার বাস্তব হিসাব (কেস স্টাডি):
অনেকেই ধারণা করতে পারেন না যে সরকারি এই সুযোগ-সুবিধাগুলো সঠিকভাবে গ্রহণ করলে একজন সাধারণ মধ্যপ্রাচ্য বা মালয়েশিয়া প্রবাসী কর্মী ৫ বছরে অতিরিক্ত কত লাখ টাকার আর্থিক সুবিধা ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা লাভ করতে পারেন। ধরা যাক, কুমিল্লা জেলার একজন কর্মী বৈধ বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স নিয়ে সৌদি আরব বা কাতারে গেছেন এবং প্রতি মাসে গড়ে ৫০,০০০ টাকা করে বছরে ৬,০০,০০০ (ছয় লাখ) টাকা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে নিজ এনআরবি একাউন্টে রেমিট্যান্স পাঠান। নিচে তাঁর ৫ বছরের সরকারি আর্থিক সুবিধার বাস্তব হিসাব দেখানো হলো:
| সরকারি সুবিধার খাত | বার্ষিক বা এককালীন আর্থিক মূল্য (BDT) | ৫ বছরে মোট আর্থিক লাভ / কাভারেজ | যাঁরা এই সুবিধাটি প্রদান করেন |
|---|---|---|---|
| ১. বৈধ রেমিট্যান্সে ২.৫% নগদ সরকারি প্রণোদনা (বছরে ৬ লাখ টাকা রেমিট্যান্স প্রেরণে) |
বছরে ১৫,০০০ টাকা নগদ বোনাস (প্রতি লাখে ২,৫০০ টাকা) | ৭৫,০০০ টাকা (সম্পূর্ণ বিনা শর্তে নগদ বোনাস) | অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক |
| ২. ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ডে সঞ্চয় মুনাফা (৫ লাখ টাকা বন্ডে বিনিয়োগ করলে) |
বার্ষিক ১২% করমুক্ত মুনাফা = বছরে ৬০,০০০ টাকা | ৩,০০,০০০ টাকা মুনাফা + ২,০০,০০০ টাকা মৃত্যু ঝুঁকি বীমা কভারেজ | জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ ব্যাংক |
| ৩. মেধাবী সন্তানের সরকারি শিক্ষাবৃত্তি (১ জন সন্তান এইচএসসি ও স্নাতক পর্যায়ে পড়লে) |
বছরে ২৭,৫০০ টাকা থেকে ৩৪,০০০ টাকা বৃত্তি | ১,৫৯,০০০ টাকা (৫ বছরের শিক্ষা সহায়তা) | ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড (WEWB) |
| ৪. প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক অভিবাসন লোন সাশ্রয় (মহাজনি সুদের বদলে ৯% সরকারি লোনে) |
গ্রাম্য মহাজনি সুদের (৩০%–৪০%) তুলনায় বার্ষিক অন্তত ৫০,০০০ টাকা সুদ সাশ্রয় | ১,০০,০০০+ টাকা সুদ ও জমি রক্ষা সাশ্রয় | প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক (PKB) |
| ৫. জীবন ও দুর্ঘটনা সুরক্ষা কাভারেজ (বীমা + অনুদান) (প্রবাসে মৃত্যু বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের ঝুঁকি সুরক্ষা) |
১০ লাখ টাকা জীবন বীমা + ৩.৩৫ লাখ টাকা কল্যাণ বোর্ড অনুদান | ১৩,৩৫,০০০ টাকা রাষ্ট্রীয় জীবন সুরক্ষা গ্যারান্টি | জীবন বীমা কর্পোরেশন ও WEWB |
উপরের বাস্তব হিসাব থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে শুধুমাত্র সরকারি নিয়ম মেনে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো, সঞ্চয়ের টাকা সরকারি বন্ডে রাখা এবং সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তির আবেদন করার মাধ্যমে একজন প্রবাসী কর্মী ৫ বছরে প্রায় ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ টাকার সরাসরি নগদ আর্থিক লাভ এবং ১৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকার জীবন বীমা ও মৃত্যু অনুদান সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেন। তাই আজই নিজের এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে দালাল ও হুন্ডি বর্জন করে সরকারি সেবাগুলোর আওতায় যুক্ত হোন।
দেশভিত্তিক প্রবাসী গাইড ও জরুরি সেবা লিংক:
আপনি বা আপনার পরিবারের সদস্য বর্তমানে কোন দেশে কর্মরত আছেন, সেই দেশের ভিসা চেক, আকামা/আইডি কার্ড যাচাই, শ্রম আইন, গ্র্যাচুইটি হিসাব এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের সেবা সম্পর্কে জানতে আমাদের দেশভিত্তিক বিশেষায়িত নির্দেশিকাগুলো অনুসরণ করুন:
- সৌদি আরব প্রবাসী গাইড: সৌদি আরব ভিসা, আকামা চেক, কফালা ও শ্রম আইন পূর্ণাঙ্গ গাইড
- কাতার প্রবাসী গাইড: কাতার ভিসা চেক, QID যাচাই, শ্রম আইন ও রিয়াল রেট গাইড
- কুয়েত প্রবাসী গাইড: কুয়েত ভিসা, সিভিল আইডি (PACI), ধারা ১৮ শ্রম আইন ও দিনার রেট গাইড
- সিঙ্গাপুর প্রবাসী গাইড: সিঙ্গাপুর ওয়ার্ক পারমিট, আইপিএ (IPA) চেক, বেতন ও জীবনযাত্রা গাইড
- বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি গাইড: বিদেশ যাওয়ার আগে করণীয়: বিএমইটি, মেডিকেল, পিডিও ও চুক্তিপত্র গাইড
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)
প্রবাসী কল্যাণ ও সরকারি আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট ও দালালমুক্ত উত্তর নিচে তুলে ধরা হলো:
যাঁরা দেশ থেকে বৈধভাবে বিএমইটি (BMET) স্মার্ট কার্ড বা ই-ক্লিয়ারেন্স নিয়ে বিদেশে যান, তাঁরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সদস্য হয়ে যান। আর যাঁরা ভিজিট বা অন্য ভিসায় গিয়ে পরে কাজের আকামা বা ভিসা লাগিয়েছেন, তাঁরা বিদেশে বসেই member.wewb.gov.bd ওয়েবসাইটে আবেদন করে এবং বাংলাদেশ দূতাবাসে নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে প্রবাসী কল্যাণ সদস্য কার্ড ডাউনলোড করতে পারবেন।
বৈধ প্রবাসী বা কল্যাণ বোর্ডের নিবন্ধিত সদস্যের প্রবাসে মৃত্যু হলে সরকারি খরচে মরদেহ দেশে আনার পাশাপাশি বিমানবন্দরে তাৎক্ষণিক দাফন খরচের জন্য ৩৫,০০০ টাকা এবং পরবর্তীতে ওয়ারিশদের ব্যাংক হিসাবে আরও ৩,০০,০০০ টাকা—অর্থাৎ কল্যাণ বোর্ড থেকে মোট ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়। এছাড়া কর্মীর বাধ্যতামূলক প্রবাসী বীমা (জীবন বীমা কর্পোরেশন) মেয়াদোত্তীর্ণ না হয়ে থাকলে অতিরিক্ত আরও ১০,০০,০০০ (দশ লাখ) টাকা বীমা দাবি পাওয়া যায়।
না। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ নির্দেশনা অনুযায়ী, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল বা এক্সচেঞ্জ হাউজের মাধ্যমে প্রেরিত যেকোনো অংকের ওয়েজ আর্নার্স রেমিট্যান্সের ওপর ২.৫% সরকারি নগদ প্রণোদনা পেতে এখন আর কোনো কাগজপত্র (যেমন—পাসপোর্ট কপি বা স্যালারি স্লিপ) জমা দিতে হয় না। মূল টাকার সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বোনাসের টাকা ব্যাংক বা বিকাশে জমা হয়ে যায়।
না। বিদেশ যাওয়ার জন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ৩,০০,০০০ (তিন লাখ) টাকা পর্যন্ত ‘অভিবাসন ঋণ’ নিতে কোনো জমি বা বাড়ির দলিল বন্ধক (Mortgage) রাখতে হয় না। শুধুমাত্র আসল ভিসা কপি, বিএমইটি নিবন্ধন এবং কর্মীর পরিবারের ১–২ জন সক্ষম জামিনদারের (Guarantor) ব্যক্তিগত গ্যারান্টি ও চেক পাতা দিলেই মাত্র ৯% সরল সুদে এই লোন পাওয়া যায়।
৫ বছর মেয়াদী সরকারি ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ডে বিনিয়োগের স্ল্যাব অনুযায়ী বার্ষিক ৯% থেকে সর্বোচ্চ ১২% পর্যন্ত সম্পূর্ণ করমুক্ত মুনাফা পাওয়া যায় (১ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে ১২% মুনাফা)। বৈধভাবে বিদেশে কর্মরত যেকোনো প্রবাসী বাংলাদেশি সর্বনিম্ন ১ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত এই বন্ড কিনতে পারেন এবং এতে ৪০%–৫০% অতিরিক্ত মৃত্যু ঝুঁকি বীমা সুবিধা রয়েছে।
হ্যাঁ। ২০১৫ সালের পর বিদেশ থেকে স্থায়ীভাবে ফেরত আসা প্রবাসীরা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ‘রাইজ’ (RAISE) প্রকল্পের আওতায় জেলা ওয়েলফেয়ার সেন্টারে নিবন্ধন ও ওরিয়েন্টেশন সম্পন্ন করলে পুনর্বাসন সহায়তা হিসেবে নগদ ১৩,৫০০ টাকা প্রণোদনা এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ৪% থেকে ৯% সুদে পুনর্বাসন ব্যবসা লোন পান।
আইনি ডিসক্লেইমার ও সরকারি তথ্যসূত্র
আইনি সতর্কবার্তা: "প্রবাসী সুযোগ সুবিধা ২০২৬: সরকার থেকে প্রবাসীরা যেসব সুবিধা পান" শীর্ষক এই নির্দেশিকাটি প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দালালচক্রের প্রতারণা প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রস্তুতকৃত একটি তথ্যমূলক গবেষণাপত্র। এটি কোনো সরকারি গেজেট বা বাণিজ্যিক আর্থিক পরামর্শ নয়। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড (WEWB), প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক (PKB) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের যেকোনো নীতিমালা, অনুদানের হার বা সুদের হার যেকোনো সময় পরিবর্তিত হতে পারে। চূড়ান্ত আবেদনের পূর্বে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন যাচাই করার অনুরোধ করা হচ্ছে।
- প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়:
https://probashi.gov.bd - ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড (WEWB):
https://wewb.gov.bd - প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক (Probashi Kallyan Bank):
https://pkb.gov.bd - বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank):
https://www.bb.org.bd